দেশে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। বেড়েছে বহুজাতিক সংশ্লিষ্টতাও। শতভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বিপুুলসংখ্যক জনবল। এই জনবলের মধ্যে রয়েছেন অনেক নারী কর্মীও। কিন্তু দেশ আলোকিত করার কাজে নিয়োজিত এই নারী কর্মীদের প্রায় সবাই কর্মজীবনের একটি বড়ো অংশে চোখে অন্ধকার দেখেন শুধু কর্মস্থলে একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে কেয়ার সেন্টার না থাকার কারণে।
দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। দুটি কোম্পানিই ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের (আইএসও) ৯০০১: ২০১৫, ৪৫০০১ এবং এসএ ৮০০০ সনদ গ্রহণ করেছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অন্যতম পূর্বশর্ত এগুলো। প্রায় ১০টি মানদণ্ড রক্ষা করে এই সনদগুলো অর্জন করতে হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে নারী কর্মীদের জন্য কর্মস্থলে ডে কেয়ার বিদ্যমান থাকা। কিন্তু সনদ গ্রহণ করলেও পিডিবি ও আরইবি—দুটি প্রতিষ্ঠানের একটিতেও ডে কেয়ার সেন্টার নেই। ফলে একদিকে ভোগান্তিতে পড়েন নারী কর্মীরা অন্যদিকে গ্রাহকসেবায় বিঘ্ন ঘটে। নারী কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে তৈরি হয় টানাপোড়েন, আর নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন বা লক্ষ্য অর্জনেও বাধা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, যে প্রতিষ্ঠানে ৪০ জনের বেশি নারী কর্মী আছেন, সেখানে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুসন্তানের জন্য শিশুকক্ষ বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের জায়গা থাকতে হবে। কিন্তু এ আইন বাস্তবে মানা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুলসংখ্যক নারী কর্মী থাকা পিডিবি ও আরইবিতে ডে কেয়ার সেন্টার না থাকায় সংস্থা, কর্মী ও গ্রাহক—তিন পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর ডে কেয়ার না থাকায় দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায়ও অনৈতিক। কেননা, যে মানদণ্ড রক্ষা করছে বলে সংস্থাগুলো অংশীজনদের জানাচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়।
দুই সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পিডিবিতে ১৪ হাজার ৬৯ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ১ হাজার ৪৪৬ জন। আর আরইবিতে ১ হাজার ৪৭৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ১১২ জন নারী। আর আরইবির আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির প্রায় ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে ১ হাজারের বেশি নারী কর্মী রয়েছেন। বিপুলসংখ্যক নারীর সিংহভাগই মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে বিপদে পড়ে যান সন্তানের লালন-পালন নিয়ে।
এ প্রসঙ্গে সদ্য মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে আরইবিতে যোগ দেওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ছোটো পরিবার। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। বাসায় গৃহকর্মীর কাছে সন্তান রেখে অফিস করতে হয়। কিন্তু নানা সমস্যা লেগেই থাকে। ফলে না পারি মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে, আর না পারি সন্তানের যত্ন নিতে। এ এক নিদারুণ কষ্টের উভয় সংকট।’
পিডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, আইএসওর নির্দিষ্ট মানদণ্ড রক্ষার কথা থাকলেও ডে কেয়ার সেন্টার না থাকায় একটি মানদণ্ড রক্ষা হচ্ছে না। কর্মস্থলে দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় অনেকেরই ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে। ঠিকভাবে কাজ করতে না পারায় অনেকে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতিও পান না।
বাংলাদেশে অন্যতম আইএসও সনদ প্রদানকারী সংস্থা ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিতাস। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী ব্যবস্থাপক তারেক আহমেদ জানান, অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি অংশীজনদের সঙ্গে ব্যবসার জন্য গ্রাহক সন্তুষ্টির পাশাপাশি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার দিকেও নজর দেয়। সে জন্যই সংস্থাগুলো বিভিন্ন ধরনের আইএসও সনদ গ্রহণ করে। পিডিবি ও আরইবি আইএসও সনদ গ্রহণ করেছে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন) আবুল কালাম শামসুদ্দিন বলেন, ‘ডে কেয়ার করার পরিকল্পনা আরইবির রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজটি এগোয়নি। তবে এটি কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে একটি কমিটি বর্তমানে কাজ করছে।’ আর পিডিবির পরিচালক সাইফুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে পিডিবির ডে কেয়ার সেন্টার না থাকলেও শিগগিরই তা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।’