গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানি গত শুক্রবার থেকে কমতে শুরু করেছে। যা রবিবারও অব্যাহত ছিল। কিন্তু জেলার ২১টি এলাকায় পাউবোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেঙ্গে যাওয়া অংশ দিয়ে এখনও একাধিক গ্রামে পানি ঢুকছে। ফলে জেলার ৩শ ৯০টি গ্রামের পানিবন্দি ৫ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা বেড়েছে।
এদিকে ফুলছড়ির কৈতকিরহাট এলাকায় গত শুক্রবার রাতে প্রায় একশ মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে দেবে গেছে। এছাড়া শনিবার রাতে গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়নের নয়াপড়া এলাকায় বাঙ্গালী নদীর বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে আরও ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধা শহরেরও অধিকাংশ রাস্তাঘাট, প্রধান দুটি কাঁচাবাজার, বিপনী বিতান, সরকারি বেসরকারি একাধিক অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পানিতে তলিয়ে আছে। পানিতে নিমজ্জিত ৪শ ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম বন্ধ। বাঁধ, সড়ক, নৌকায় ও উঁচু স্থানসহ ১৮৪টি সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া এসব মানুষ খাদ্য, সুপেয় পানি ও শৌচাগার সমস্যায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন তারা গবাদি পশু নিয়ে। অপরদিকে পাঁচদিন যাবত রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে। জেলা শহরের সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গাইবান্ধা-বালাসি সড়কেও যানবাহন চলাচল বন্ধ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, গত চব্বিশ ঘন্টায় তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ২৬ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার, নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ঘাঘটের পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার এবং করতোয়ার পানি ১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এখনও প্রবাহিত হচ্ছে।
রবিবার ফুলছড়ির কৈতকিরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বানভাসি নিঃস্ব মানুষগুলো ভেঙ্গে যাওয়া ওই বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা জানান, বাঁধ ভাঙ্গার শব্দে হঠাৎ ঘুমন্ত মানুষজন জেগে উঠে কোনোমতে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেয়। তবে বানের পানিতে ভেসে যায় ঘরের জিনিসপত্র। শুক্রবার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকারী কর্মকর্তা তাদের খোঁজ খবর নেয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
কৈতকিরহাট কৃষক ইয়াদ আলী জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে কৈতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনে বাঁধের একটি ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি ঢুকছিল। এ সময় এলাকাবাসী বালির বস্তা ও পল (খড়) দিয়ে গর্তটি বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে কোন কাজ না হলে হাল ছেড়ে দেয়। এরপর হঠাৎ রাত ১টার দিকে প্রচণ্ড শব্দে বাঁধটি ধ্বসে যায়। দোতলা স্কুলভবনটিসহ আশপাশের দোকানপাট ও দুই শতাধিক ঘরবাড়ি মুহূর্তে মাটিতে দেবে যায়। গ্রামের বাসিন্দারা কোনোমতে নিজের জীবন নিয়ে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নেয়। এ সময় মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। গ্রামের ঘরবাড়ীগুলো পানির তোড়ে ভেসে যায়।
ওই বাঁধে আশ্রিত নুরু মিয়া বলেন, ৬দিন হলো এখানে ছেলে মেয়ে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কোন ত্রাণ পাননি।
গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটির সুমন কুমার বর্ম্মন জানান, পানি কমতে শুরু করলেও বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে তাদের গ্রাম ও ঘাঘোয়া গ্রামে এখনও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে সুপেয় পানির ব্যাপক সংকটে পড়েছেন বাঁধে আশ্রিত বানভাসিরা। রবিবার ফুলছড়ি কঞ্চিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় একটি বেসরকারী সংগঠন রিক্সাভ্যানে পানির ট্যাংকি থেকে বাঁধে আশ্রিত বানভাসিদের পানি সরবরাহ করছেন। আর বানভাসিরা লাইনে দাড়িয়ে সেই পানি নিজ নিজ পাত্রে নিচ্ছেন।
ওই বাঁধে ৬দিন থেকে আশ্রয় নেওয়া ওমিছা বেগম বলেন, 'খাবার না দিলেও খাবার পানি দেওয়ার কথা পত্রিকাত লেখেন বাহে। চারদিকে এতো পানি তারপরও পানির তেষ্ঠায় (তৃষ্ণায়) গলা শুকিয়া কাঠ হয়া গ্যাছে।'
ফুলছড়ির হাজিরহাট বাঁধে আশ্রিত আজিজ মিয়া বলেন, 'বেটা ছোল আর ছোট ছোলগুলা যেটি সেটি পায়খানা-প্রসাব করব্যার পারে, কিনতো হামারঘরে মহিলারা বিপদোত পড়চে।’
বানভাসি ফুলছড়ির ভাজনডাঙ্গা গ্রামের দিনমজুর আমজাদ মিয়া (৫০) বলেন, ‘উপজেলাত থাকি হামারঘরে গাও অনেক দূরোত। নাওয়োত আসতে তিন-চার ঘণ্টা সমায় নাগে। তাই কাউয়ো আসপার চায় না। সগলে খালি উচে জায়গাত আসি ইলিপ দিয়া যায়।’
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান জানান, ৩টি এলাকায় বাঁধ ধসে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ২১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যায় এ পর্যন্ত জেলার সাতটি উপজেলার দুইটি পৌরসভাসহ ৫১টি ইউনিয়নের ৩শ ৯০টি গ্রামের ৫ লাখ ১৪ হাজার সাড়ে ৮৯ লোক পানিবন্দি হয়ে আছে। যাদের ৪৫ হাজার ৪শ’ ৯৫টি বসতবাড়ি পানির নীচে। তার মধ্যে পানিবন্দি ৭৪ হাজার ১শ ৬৯ লোক জেলার ১৮৪টি সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।
এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫শ’ ৭৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং ২৩৫ কি.মি. পাকা সড়ক। ৬৩ কি.মি. বাঁধ ও ২১টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১১ হাজার ৯শ ২৮ হেক্টর বিভিন্ন ফসলি জমি। পানিতে নিমজ্জিত ৪শ ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম বন্ধ। ভেসে গেছে ৬ হাজার ৬শ ৫৮টি পুকুরের মাছ। পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৯ হাজার ২২৪ টি টিউবওয়েল। বন্যা কবলিত এলাকায় কাজ করছে ৭৫ টি মেডিকেল টিম।
গাইবান্ধা রেলস্টেশন মাষ্টার আবুল কাশেম জানান, সান্তাহার-লালমনিরহাট রেলরুটের গাইবান্ধা সদরের বাদিয়াখালি থেকে ত্রিমোহিনী পর্যন্ত রেল পথের প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশ ডুবে গিয়ে কিছু স্থানে স্লিপার, পাথর ও মাটি সরে যাওয়ায় গত বুধবার থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাইবান্ধার বোনারপাড়া রেলস্টেশন থেকে সান্তাহার এবং গাইবান্ধা রেলস্টেশন থেকে লালমনিরহাট ও দিনাজপুরের মধ্যে ট্রেন চলাচল করছে।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে ছেলেধরা সন্দেহে ১২ ব্যক্তি গণপিটুনির শিকার
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন জানান, বন্যা কবলিত উপজেলাগুলো জেলা ত্রাণ ভান্ডার থেকে ১ হাজার মে. টন চাল ও ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৬ হাজার কার্টন শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারমধ্যে এখন পর্যন্ত ৫৮৫ মে. টন চাল, নগদ ৯ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ৫৫০ কার্টন শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু