ভোক্তা অধিকার আইন এবং আমাদের করণীয়

 

অন্যান্য অধিকারের থেকে ভোক্তা অধিকার কিছুটা ভিন্ন। যিনি উত্পাদিত পণ্য ও সেবা চূড়ান্ত ভোগের জন্য ক্রয় করেন, অর্থনীতির ভাষায় তাকে ভোক্তা বলে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে যিনি কোনো পণ্য ক্রয় করেন কেবলমাত্র নিজে ভোগ করার জন্য তিনিই ভোক্তা। একজন ব্যক্তি যখন কোনো পণ্য ক্রয় করেন তখন তার জানার অধিকার রয়েছে পণ্যটি কবে উত্পাদিত হয়েছে, কোথায় উত্পাদিত হয়েছে, এর কাঁচামাল কী কী, মূল্য কত, প্রভৃতি। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে একজন বিক্রেতা বাধ্য। যদি কোনো বিক্রেতা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেন বা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তখন আইন অনুযায়ী তাতে ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন্ন হয়। জাতিসংঘ স্বীকৃত ভোক্তা অধিকার ৮টি—মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার, জানার অধিকার, অভিযোগ করা ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার, ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার, সুস্থ পরিবেশের অধিকার।

পণ্য ক্রয়ে প্রতারণার হাত থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের ফলে কোনো ভোক্তা পণ্য ক্রয়ে পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, মূল্যসহ কোনো বিষয়ে প্রতারিত হলে তার প্রতিকার পেয়ে থাকেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সম্পর্কে অবগত নয়। এমনকি শিক্ষিত সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যেও এই আইন নিয়ে তেমন কোনো ধারণাই নেই। ফলে তাদের প্রতারিত হবার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

বর্তমানে অনলাইনে কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু ওয়েবসাইটে পণ্যের যে মান উল্লেখ করা থাকে, মূল্য পরিশোধ করার পর পণ্য হাতে পেয়ে দেখা যায় বর্ণিত গুনাগুণ সেই পণ্যের মধ্যে নেই। তাই ভোক্তাকে এই আইন সম্পর্কে জানতেই হবে এবং নির্ধারিত পন্থায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। তাহলেই অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং ভোক্তার প্রতারিত হবার সংখ্যাও কমে আসবে।

আমি গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনে বেকারির একটি পাউরুটি কিনি। তা খেয়ে পেটব্যথা অনুভব করলে মোড়ক লক্ষ করে দেখতে পাই তাতে উত্পাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্য উল্লেখ করা নাই। এরপর আমি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করি। ৪ মার্চ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনা কার্যালয়ে আমার ও ঐ বেকারির মালিকের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং এরপর থেকে পণ্যে সকল তথ্য সংযোজন করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ৪ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী অভিযোগকারীকে মোট জরিমানার ২৫ শতাংশ প্রদান করার বিধি থাকায় আমাকে ১ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।

কোনো ক্ষেত্রে পণ্য কিনে প্রতারিত হলে অভিযোগ দায়ের করার পদ্ধতি খুবই সহজ। বর্তমানে প্রত্যেকের হাতে হাতে স্মার্টফোন। গুগোল প্লে-স্টোরে সংরক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপসটির মাধ্যমে খুব সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ দিয়ে অভিযোগ করা যায়। তবে অভিযোগটি পণ্য কেনার ৩০ দিনের মধ্যে দায়ের করতে হবে।

ভোক্তা অধিকার আইন নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। সবাই সচেতন হলেই আইনটির সঠিক বাস্তবায়ন হবে। আমাদের একটুখানি সচেতনতাই পারে নিরাপদ খাদ্যের ও ভেজালমুক্ত পণ্যের বাংলাদেশ গড়তে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়