তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং পাকিস্তান টাইমসের সম্পাদক জেড এ সুলেরির মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ছিল বহুল আলোচিত ও বিদগ্ধ পাঠক সমাজের নিকট উপভোগ্যের বিষয়। এই দুই জাঁদরেল সম্পাদকের মধ্যে সাংবাদিকতার দর্শন লইয়া সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল, যাহা তাহাদের কর্মজীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও লেখনীতে প্রতিফলিত হইত। মানিক মিয়া সাংবাদিকতাকে কেবল একটি পেশা হিসাবে দেখেন নাই, বরং ইহাকে দেশ ও দশের কল্যাণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের একটি মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করিয়াছেন। তিনি সরকারি চাকুরি ছাড়িয়া সাংবাদিকতা পেশায় আসেন এবং রাজনীতি করিবার জন্যই সাংবাদিকতার অঙ্গনে প্রবেশ করেন। যদিও তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে কখনো অংশগ্রহণ করেন নাই। এমনকি তথ্যমন্ত্রী হইবার প্রস্তাবকেও তিনি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করিবার মতো দৃঢ়চেতার অধিকারী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাহার সাংবাদিকতা ছিল একজন 'স্টেটসম্যানের' মতো, যিনি জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে কলম ধরিতেন।
মানিক মিয়ার বিখ্যাত কলামের নাম ছিল 'রাজনৈতিক মঞ্চ', যাহা তিনি তখনকার রীতি অনুযায়ী লিখিতেন ‘মোসাফির' ছদ্মনামে। প্রকৃতপক্ষে এই 'রাজনৈতিক মঞ্চ' ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুখপত্র এবং মানিক মিয়া ছিলেন তাহার নির্ভীক ভাষ্যকার। তিনি জেল- জুলুম সহ্য করিয়াও সত্য প্রকাশে ছিলেন অবিচল। তাহার সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা এবং তাহাদের স্বাধিকারের পক্ষে কথা বলা। তিনি বিশ্বাস করিতেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশন নহে, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এই জন্য জেড এ সুলেরি যেইখানে তাহার সাংবাদিকতাকে চাকুরির অংশ হিসাবে এবং তৎকালীন সামরিক ও রক্ষণশীল সরকারের নীতির সমর্থনে ব্যবহার করিয়াছেন, সেইখানে মানিক মিয়া সাংবাদিকতাকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিয়াছেন যথার্থভাবে। যেইখানে ব্যক্তিগত লোভ বা চাকুরির নিরাপত্তার চাইতে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল মুখ্য বিষয়।
বাস্তব ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অবিসংবাদিত সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জীবনে কিছু কনভিকশন বা দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। তিনি তাহার জীবন এই কারণেই উৎসর্গ করিবার জন্য সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন। সাধারণত রাজনীতিবিদগণ ক্ষমতা ও পদ-পদবির জন্য তাহাদের জীবনে ত্যাগ-তিতিক্ষা করেন; কিন্তু মানিক মিয়া কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবির কাঙাল ছিলেন না। বলিতে গেলে তাহার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়াছে লেখাপড়া লইয়া এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করিয়া। তাই তাহার জীবন হইতে আমরা এই শিক্ষা লাভ করিতে পারি যে, প্রত্যেক মানুষের জীবনে বিশেষ কনভিকশন থাকা এবং এই জন্য সকল কিছু ত্যাগ স্বীকার করিতে সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। তিনি নিখাদ দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদিতে আমৃত্যু বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাহার সময় জাতিকে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, পাকিস্তান ব্রিটিশ কলোনি হইতে স্বাধীনতা লাভ করিলেও দেশ গড়িবার জন্য যেই ঐক্য দরকার, তাহা পাকিস্তানের দুই অংশে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করিবার কারণে আর অবশিষ্ট ছিল না। জাতীয় ঐক্যের জন্য যেই দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞা দরকার, তাহাও ছিল অনুপস্থিত। ঐক্যের বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ-শাসনে নিষ্পেষিত করা হইয়াছিল। বিশেষত ১৯৪৭ সাল হইতেই গণমানুষের অধিকার হরণ করিবার জন্য যেই চক্রান্ত শুরু হয়, তিনি চাহিয়াছিলেন তাহার মুখোশ উন্মোচন করিয়া দিতে।
অবশ্য তাহার সহিত তদানীন্তন রাজনীতিবিদদের চিন্তার ভিন্নতা যে ছিল না, তাহা নহে। তবে তিনি বিশ্বাস করিতেন মানুষের জন্য কাজ করিতে পারিবার মধ্যেই যেই কোনো মানুষের জীবনের সার্থকতা নিহিত। তাহার এই কনভিকশনের সহিত আমরা একমত না-ও হইতে পারি; কিন্তু তিনি তাহার সেই বিশ্বাসে ছিলেন সত্যনিষ্ঠ ও আন্তরিক। আমরা মনে করি, তাহার লেখনী মূলত বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিতে এবং তাহাদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করিতে অনুপ্রাণিত করিয়াছিল বিধায় এই আধুনিক কালেও তাহার আদর্শ, দর্শন ও নীতি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাহার ন্যায় নির্ভীক ও আপসহীন সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা আজও অনস্বীকার্য। তাই আজ নিৰ্ভীক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমরা তাহাকে গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করি। ইহার পাশাপাশি তাহার মৃত্যু দিবসে আমরা তাহার রুহের মাগফেরাত কামনা করি।