ষাটের দশকেও রাজধানীর খালগুলি ছিল মানবদেহের শিরা-উপশিরার মতো ছড়াইয়া-ছিটাইয়া। ছিল প্রাণবন্ত। কিন্তু এখন সেগুলির অধিকাংশেরই মরণদশা। এসকল খাল ভরাট করিয়া অবৈধভাবে দোকানপাট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করিয়াছে প্রভাবশালীরা, অসাধু ব্যক্তিরা। সেই খালগুলি উদ্ধারের তাগিদ অনুভব করিয়াছে সরকার। দুই বত্সর আগে খাল দখলকারী ২৫৮ জনের একটি তালিকা প্রণয়ন করিয়াছিল ঢাকা জেলা প্রশাসন। জরিপ করিয়া ঢাকার কোন খালের কোন অংশ কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি দখল করিয়াছে তাহার তালিকা তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে খালগুলির বর্তমান অবস্থা, খালের মালিকানা, অবৈধ দখলদার কাহারা, খালের কতটুকু অংশ বালি দিয়া ভরাট করা হইয়াছে, খালের কোন কোন জায়গায় আবর্জনার স্তূপে অচল হইয়াছে, কোন খাল সচল আছে—এসকল তথ্য যুক্ত করা হইয়াছে। অনেক আগেই প্রতিবেদনটি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসাকে দিয়াছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। কিন্তু এই তিন সংস্থার মধ্যে একাধিক বৈঠক হইলেও খাল পুনরুদ্ধারে কোনো অগ্রগতি আসে নাই। ফলে তালিকাতেই আটকাইয়া আছে উদ্যোগ।
রাজধানীতে ১৯৮৫ সালেও ৫০টি খালের অস্তিত্ব ছিল। এখন টিকিয়া আছে মাত্র ২৬টি খাল। এগুলিও অনেকটাই মৃতপ্রায়। এইসকল খালের মোট দৈর্ঘ্য ৭৯ হাজার ৮০৬ মিটার বা প্রায় ৮০ কিলোমিটার। বিদ্যমান ২৬টি খালের মধ্যে পাঁচটি খাল আবার বিস্ময়করভাবে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হইয়া আছে। অতীতে রাজধানীর খালগুলির সঙ্গে চারিপার্শ্বের চারটি নদ-নদীর সংযোগ ছিল। সূত্রাপুর হইতে লোহারপুল হইয়া বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বসিলা হইয়া বুড়িগঙ্গা, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর হইয়া তুরাগ, উত্তরখান হইয়া তুরাগ, খিলক্ষেত-ডুমনি হইয়া বালু ও মানিকনগর হইয়া শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচল করা যাইত। বুড়িগঙ্গা নদীর বসিলা হইতে ধানমন্ডি, তেজগাঁও, রামপুরা হইয়া তুরাগ নদে মিলিয়াছিল শুক্রাবাদ খাল। এই খালের রায়েরবাজার, জিগাতলা ও শুক্রাবাদ এলাকায় এখন আর কোনো অস্তিত্ব নাই। খালের ৮০ শতাংশই স্থায়ী স্থাপনার দখলে চলিয়া গিয়াছে। মোহাম্মদপুর ও পিসি কালচার হাউজিংয়ের ভিতর দিয়া প্রবাহিত কাটাসুর খালটি ময়লা-আবর্জনায় ধুঁকিতেছে। অন্যান্য খালের অবস্থাও তথৈবচ। রাজধানীর খালগুলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত রাখিবার দায়িত্ব ওয়াসার। সেই ওয়াসার কর্মকর্তারাই বলিতেছেন, যথাযথ নজরদারির অভাবে সতর্কবাণী বা সাইনবোর্ড দিয়াও খালের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।
শহরের অনেক খাল দখল হইয়া যাওয়ায় জলাবদ্ধতা এখন চরমে। স্বল্প সময়ের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই অনেক সময় রাস্তায় পানি জমিয়া যায়। জেলা প্রশাসন তাহাদের প্রতিবেদনে বলিয়াছিল, যে খালগুলি এখনো টিকিয়া আছে সেগুলির অধিকাংশ ময়লা-আবর্জনার চাপে স্বাভাবিক প্রবাহ ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না। চলমান অবস্থার উন্নতি না হইলে বা জলাশয় রক্ষায় কঠিন পদক্ষেপ না লইলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে রাজধানীতে আর খালের কোনো অস্তিত্ব থাকিবে না। খালগুলিকে উদ্ধার করিয়া যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করিতে পারিলে ঢাকা মহানগরকে একটি মনোরম নগরে পরিণত করা এখনো সম্ভব। আমরা আশা করিব, প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যের কাছে নতি স্বীকার না করিয়া ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন খালগুলি উদ্ধার করিয়া শহরটির প্রাণ বাঁচাইতে উদ্যোগ গ্রহণ করিবে।