লর্ডসের সবুজ গালিচায় ম্যাচের শেষ বলটি যখন বাউন্ডারি পেরিয়ে গেল, তখনই যেন থমকে গেল সময়। স্কোরবোর্ডে লেখা হয়ে গেল ইতিহাস, দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮২/৫। জয় ৫ উইকেটে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন দল এখন তারাই। বিষয়টি তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ড্রেসিংরুমের করিডোরে বসা টেম্বা বাভুমা। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছেন, কোচিং স্টাফরা এসে তাকে টেনে তুললেন, প্রোটিয়া অধিনায়কও বুঝতে পারলেন, তারা আর চোকার নন, চ্যাম্পিয়ন। যে দলটিকে বছরের পর বছর ধরে ক্রীড়াজগতে চোকার তকমা দেওয়া হয়েছে, সেই দলটি লিখেছে নতুন ইতিহাস। বড় মঞ্চে বারবার গলা শুকিয়ে যাওয়া, স্বপ্নভঙ্গ, হতাশা তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন দল এখন দক্ষিণ আফ্রিকা।
ইতিহাস গড়া বিকালে দলটির সবচেয়ে আবেগঘন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন বাভুমা। সতীর্থরা যখন উল্লাসে মেতেছেন তখন বাভুমার দু চোখে শুধুই কৃতজ্ঞতা আর ক্রান্তির জলছোঁয়া। এরপরের মুহূর্তগুলো আরও হৃদয়ছোঁয়া। শিরোপা হাতে তুলে নিলেন বাভুমা, দলীয় উদযাপন শেষে কোলে তুলে নিলেন ছোট্ট শিশু সন্তানকে। এক হাতে ট্রফি, আরেক হাতে সন্তান-দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের বিষয়টি যেন এক প্রতীকী দৃশ্য হয়ে ওঠে। যেখান থেকে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন, উত্তরাধিকার আর বিজয়ের অভিপ্রায়। বাকিরা যখন উদযাপন করছেন, তখন বাভুমা একাই হেঁটে যাচ্ছেন লর্ডসের চারপাশে- কখনো ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিচ্ছেন, কখনো চিৎকার করে কিছু বলছেন আকাশের দিকে তাকিয়ে, যেন বলছেন, 'দেখো, আমরা পেরেছি।'
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে ট্রফির সংখ্যা খুব বেশি নয়। সর্বশেষ বৈশ্বিক শিরোপা পেয়েছিল ১৯৯৮ সালে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত নকআউট চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। সেই জয়ের পর কেটে গেছে ২৭টি বছর। এই দীর্ঘ অপেক্ষার শত শত স্বপ্নভঙ্গ, বহু অশ্রুপাত হয়েছে প্রোটিয়াদের। কখনো দুর্ভাগ্য, কখনো চাপ, কখনো নিজের ভুলে ট্রফির হাতছানি থেকে পিছিয়ে গেছে দলটি বিশেষ করে 'চোকার' শব্দটি দলের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল, যেন সেটাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই অভিশপ্ত ইতিহাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল হ্যান্সি ক্রোনিয়ের দল, জ্যাক ক্যালিসের কান্না, এবি ডি ভিলিয়ার্সের হতবাক মুখ।
কিন্তু লর্ডসের এই বিকাল সে তকমা ভেঙে দিয়েছে চিরদিনের মতো। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ সহজ ছিল না-স্টার্ক, কামিন্স, হ্যাজলউড, লায়নদের নিয়ে বিশ্বসেরা এক ইউনিট। কিন্তু তাদেরই ছকভাঙা পরিকল্পনাকে চূর্ণ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার দৃঢ়তা ও একাগ্রতা।
চোকার তকমা কেন ছিল?
১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা একটি দারুণ সুযোগ হাতছাড়া করেছিল। শেষ ওভারে জয় নিশ্চিত করতে প্রোটিয়াদের আর এক রান দরকার ছিল। কিন্তু শেষ দুই বলে সেটি তারা করতে পারেননি। ইনিংসের শেষ বলে রানআউট হয়ে যান বাংলাদেশের সাবেক পেস বোলিং কোচ ও তখনকার তারকা পেসার অ্যালান ডোনাল্ড। ম্যাচ ড্র হওয়ার পরে নেট রানরেটে পিছিয়ে ফাইনাল থেকে ছিটকে যায় দলটি। এই ম্যাচ থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে 'চোকার' বলা শুরু হয়। এরপর ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিলে তাদের 'চোকার' পরিচিতি আরও মজবুত হয়। টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করার বদলে ভুল কৌশল ও পরিকল্পনার কারণে তারা বাদ পড়ে।
২০০৭ ও ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে চাপের মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। ২০২৩ সালের সেমিফাইনাল থেকেও দলটি বাদ পড়ে। তাতে চোকার তকমা আরও দৃঢ় হয়েছিল। অবশেষে সেটি থেকে মুক্তি পেল দলটি। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই তকমা বহন করে অবশেষে ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হলো প্রোটিয়ারা। যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হেরে এই অভিধা তারা পেয়েছিল, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই হারিয়ে মুক্তি পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্যদিকে ব্যাক টু ব্যাক শিরোপা ধরে রাখা হলো না অজিদের। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম মৌসুমে ফাইনাল জিতেছিল নিউজিল্যান্ড, দ্বিতীয়টি অস্ট্রেলিয়া। এবার তৃতীয় মৌসুমে সেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নতুন চ্যাম্পিয়ন দল হলো দক্ষিণ আফ্রিকা।