ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমার পরও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) গতিও নিম্নমুখী। নভেম্বর মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এখাতের আয় ৩ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে ১১৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। যা গত বছর একই সময় ছিল ১২১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। এছাড়া আগের মাস অক্টোবরের চেয়েও নভেম্বরে প্রবাসী আয় কমেছে ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে অর্থবছরের পঞ্চম মাস পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার পরও রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ কমেছে। এতে রিজার্ভের ওপরও পড়ছে। রিজার্ভ এখন আবার ৩০ বিলিয়নের ঘরে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স সংক্রান্ত যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৬২৮ কোটি ৬৩ লাখ (৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন। গত বছরেরর জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশে ৫৭৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। এই হিসাবে পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স্র বেড়েছে ৯ শতাংশ। তবে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে অর্থাত্ গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে সদ্য সমাপ্ত নভেম্বর মাসে ৩ শতাংশ কম রেমিট্যান্স বাংলাদেশে এসেছে। এছাড়া চলতি বছরের অক্টোবর মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২৪ কোটি ডলার।
রেমিট্যান্সের এই ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নেও (রিজার্ভ) টান পড়েছে। রবিবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালের পর রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামেনি।
গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই রেমিট্যান্স ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত অর্থবছর ১৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হলেও রেমিট্যান্স ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি, কারণ তার আগের বছর রেমিট্যান্স অনেক কম এসেছিল।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও তা অগাস্টে থাকেনি। সেপ্টেম্বরে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও অক্টোবর-নভেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি হবে। তবে গত অর্থবছরের মতো ভালো প্রবৃদ্ধি এবার নাও হতে পারে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে যেসব ভাইবোনকে আমরা বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছি, তাদের অবশ্যই দক্ষ করে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি তারা যেন কোনো ঝামেলা ছাড়া কম খরচে দ্রুত টাকা দেশে পাঠাতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্সের নিম্নগতি সরকারের নীতি-নির্ধারকদের কপালে ভাঁজ ফেলেছিল। রেমিট্যান্স বাড়াতে মাশুল না নেওয়াসহ নানা ঘোষণাও দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাশুল কমানোর সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয় বাজারে ডলারের তেজিভাব এবং হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে গত অর্থবছর রেমিট্যান্স বাড়ে। খরা কাটিয়ে বাংলাদেশ ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষ করে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে। বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো।
রিজার্ভে টান : রেমিটেন্সের ধীরগতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়েছে। রবিবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। আমদানি বাড়ার কারণেও রিজার্ভে চাপ পড়েছে। গত বছরের ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে তা বেড়ে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উঠে। ৩১ অক্টোবর তা কমে ৩২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন ৩৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। তারপর থেকে রিজার্ভ নিম্নমুখী।