ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার

বর্তমান সময়ে ব্যাংকবিহীন সমাজব্যবস্থার কথা ভাবা যায় না। একটা সময়ে যখন দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ছিল অনেক কম, তখন ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণের জন্য আজকের মতো এত বেশিসংখ্যক মানুষ ভিড় করত না ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায়। ব্যাংক ছাড়াই ভিন্নভাবে আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে জীবন-যাপনের সুযোগ ছিল, ফলে তখন ব্যাংকে না গিয়ে ব্যাংকে কোনো হিসাব না খুলেও চলতে পারতেন তারা। কিন্তু সময়ের আবর্তনে, সামাজিক বিবর্তনের পালাবদলে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে। নতুন এই সময়ে শহর কিংবা গ্রাম—সর্বত্রই ব্যাংক একটি সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যাংকে না গিয়ে, আর্থিক লেনদেন না করে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা একপ্রকার অসম্ভবই বলা যায় বর্তমানে।

বাংলাদেশের ব্যাংক-ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে গত কয়েক দশকে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে চড়াই-উত্রাই পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক-ব্যবস্থা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্রমবিকাশমান ব্যাংক-ব্যবস্থা। ব্যাংক-ব্যবস্থাকে দুর্বল ও অনুন্নত রেখে শক্তিশালী অর্থনীতির আশা করা যায় না কোনোভাবেই। আমাদের ব্যাংক-ব্যবস্থায় এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সমস্যা, সংকট রয়েছে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই  ব্যাংক-ব্যবস্থা। বর্তমানে দেশে ৬২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। যথেষ্টসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি, বিদেশি ব্যাংক থাকার পরও গত কয়েক বছরে আরো বেশ কিছুু নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে ব্যাংক-ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করছে এখনো।

একটা বিষয় সবাইকে স্বীকার করতে হবে, আমাদের এখানে বিকাশমান ব্যাংক-ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে ২০০০ সালের পরবর্তী দুই দশকে  দেশের ব্যাংকিং খাতে বড়ো ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে আগের চেয়ে অনেক গুণ বেশি গ্রাহককে দ্রুত, আধুনিক, ঝামেলামুক্ত, নির্বিঘ্ন ব্যাংকিং সেবা দেওয়া সহজ এবং সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে কর্মদক্ষতা ও মুনাফাও। এখন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড একমুহূর্তের জন্য পরিচালনার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো উজ্জ্বল প্রকাশ আমাদের ব্যাংকিং খাত। এখানে যাবতীয় ব্যাংকিং লেনদেন, হিসাব-নিকাশ, অর্থ স্থানান্তরসহ সব কাজই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। মাত্র কিছু সময়ের জন্য যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে একটি ব্যাংকের চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। যদি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের কোনো ক্ষতি সাধিত হয়, সেটা কোনো না কোনোভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু একটি ব্যাংকের অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার যদি ভেঙে পড়ে, বিপর্যস্ত হয়, তাহলে সেই ব্যাংকের পক্ষে এক দিনও টিকে থাকা সম্ভব নয়।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি) কারণে দেশে প্রথাগত ব্যাংকিং মাধ্যমের লেনদেনকে ছাড়িয়ে গেছে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন। এর ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা ও উত্পাদনশীলতা বেড়েছে বহুগুণ। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের মুনাফা বৃদ্ধিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং-ব্যবস্থা শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। নির্ভুল লেনদেনের মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়াতে আইসিটির ব্যবহার এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দুই দশকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকের লেনদেনের হারও বেড়ে যাচ্ছে অনেক গুণ। লেনদেনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একজন কর্মীর আর্থিক লেনদেনের দক্ষতাও এই সময়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের মুনাফাও বেড়ে গেছে অনেক—আজ এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ব্যাংক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে দারুণ গতির সঞ্চারকারী তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিকে ব্যাংক খাতের একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রযুক্তির উত্কর্ষ দিনে দিনে বাড়ছে। সারাদেশের বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিতদের ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে সফল ও কার্যকর হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত গ্রাম, দুর্গম পার্বত্য এলাকায়ও ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব ও সহজতর হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো যথাসম্ভব স্বল্প খরচে আর্থিক, বীমা ও অন্যান্য সেবা প্রদানের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেসব অঞ্চলে যাতায়াত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, সেসব জায়গায় মোবাইল ব্যাংকিং বেশ কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও প্রণোদনা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উপকারভোগীদের জন্য সহজলভ্য করে তোলা হচ্ছে। সব মিলিয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রয়োগ বাংলাদেশের ব্যাংক-ব্যবস্থাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রাপ্তি অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।

n লেখক :ব্যাংকার