ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ছোটো বেলায় পৃথিবীর রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখা বরিস জনসন। গতকাল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের পক্ষ থেকে তাঁকে নেতা নির্বাচিত করার বিষয়টি জানানো হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টকে হারিয়ে দলের নেতা নির্বাচিত হন বরিস জনসন। তিনি ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। আজ বুধবার বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। আর বিদায় নেবেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরিস জনসনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বরিসকে অভিনন্দন জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সতর্কও করে দিয়েছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের
রক্ষণশীল দলের ৯২ হাজার ১৫৩ সদস্যের ভোট পেয়েছেন বরিস জনসন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেরেমি হান্ট পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। আজ থেরেসা মে বাকিংহাম প্রাসাদে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাত্ করতে যাবেন। এরপর রানি এলিজাবেথ বরিস জনসনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। আজই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বরিস। ফলাফল ঘোষণার পর ৫৫ বছর বয়সী জনসন অঙ্গীকার করে বলেছেন, আমরা ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ব্রেক্সিট কার্যকর করতে যাচ্ছি এবং এর সকল সুযোগ-সুবিধাও আমরা ভোগ করব। জয়ের আধা ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রিয় নেতা বরিস জনসনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বরিস ভালো কিছু করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
অহমিকা আর ব্যক্তিত্বে মোড়া রাজনীতিক
ব্রিটেনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনীতিকদের তালিকার অন্যতম শীর্ষে বরিস জনসন। কেবল বিতর্কিতই নয়-বাচনভঙ্গি, শব্দের ক্ষুরধার ব্যবহার, চাহনি, মজা করে কথা বলার অসামান্য ক্ষমতা, এলোমেলো চুল, ব্যক্তিগত জীবনের বিবেচনায় তিনি অন্য দশজন রাজনীতিকের থেকে আলাদা। বিয়ে না করেই বসবাস করছেন তাঁর চেয়ে ২৫ বছরের ছোটো এক বান্ধবীর সঙ্গে। বরিস জনসন এবং ক্যারি সিমন্ডস হবেন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের প্রথম অবিবাহিত দম্পতি। ২০০৮ সাল থেকে দুই দফায় লন্ডনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে জনসন যখন আবার টোরি পার্টির টিকিটে এমপি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন, তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, আমি মাঠে আমার তারকা খেলোয়াড়দের চাই। অবশ্য পরে ব্রেক্সিট গণভোটের সময় বরিস জনসন ডেভিড ক্যামেরনের বিপরীতে গিয়ে ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণা চালান। মার্কিন নাগরিক
১৯৬৪ সালের ১৯ জুন আলেকজান্ডার বরিস দ্য ফেফেল জনসনের জন্ম নিউ ইয়র্কে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব রেখে দিয়েছিলেন। বাবা ছিলেন কূটনীতিক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও এখন তাঁকে কনজারভেটিভ পার্টির কট্টর ডানপন্থি অংশের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছাত্র জীবনে অল্প সময়ের জন্য বামধারার সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনোর পর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। দি টাইমস পত্রিকায় কাল্পনিক একটি উদ্ধৃতি ব্যবহারের জন্য চাকরি খুইয়েছিলেন। তারপর আরো দুই একটি পত্রিকায় কাজ করার পর যোগ দেন বিখ্যাত দ্য টেলিগ্রাফে। ব্রাসেলসে ঐ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।
মুসলিম হেরিটেজ
বরিস জনসনের প্রপিতামহ অর্থাত্ তাঁর দাদার বাবার নাম ছিল আলী কেমাল। জাতিতে তুর্কি মুসলিম। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আলী কেমাল প্রথমে একজন সাংবাদিক ছিলেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। অটোম্যান মন্ত্রিসভায় খুব কম সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। ১৯২০ এর দশকে আলী কেমাল গণপিটুনিতে নিহত হন। তাঁর মুসলিম হেরিটেজের কথা মাঝেমধ্যেই প্রকাশ্যে বলেন বরিস জনসন। তবে সম্প্রতি বোরকা পরা নারীদের নিয়ে কটু মন্তব্যের পর তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে গালমন্দ শুনতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রিত্বের স্বপ্ন
২০১৬ সালে বেক্সিট গণভোটে হারার পর ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় যোগ দেন বরিস জনসন। তবে থেরেসা মের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে সরে দাঁড়ান। পরে কনজারভেটিভ পার্টির ব্রেক্সিটপন্থিদের চাপে বরিস জনসনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন থেরেসা মে। কিন্তু ব্রেক্সিট নিয়ে থেরেসা মের সঙ্গে বিরোধে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর থেরেসা মে পদত্যাগ করায় প্রধানমন্ত্রীর দৌঁড়ে আবার যুক্ত হন বরিস। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনে কোনো চুক্তি ছাড়াই তিনি ব্রিটেনকে ইইউ থেকে বের করে আনবেন এই অঙ্গীকার করে দলে প্রিয় হন। তবে এই সময়ে ব্রেক্সিট কার্যকরে ব্যর্থ হলে বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ খুবই সংক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।