নূতনরূপে ডোনাল্ড ট্রাম্প!

এই যেন এক নূতন ডোনাল্ড ট্রাম্প! যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এই প্রেসিডেন্টের কথাবার্তা, চালচলন ও চিন্তাভাবনায় বেশ পরিবর্তন লক্ষণীয়। ২০১৭ সাল হইতে ২০২১ মেয়াদের তুলনায় আজিকার প্রেসিডেন্টকে অনেক ক্ষেত্রে মিলানো যায় না। প্রথম মেয়াদে বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ফ্যামিলি সেপারেশন পলিসি, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অদায়িত্বশীলতা, মেয়াদ শেষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল না মানিয়া লইয়া তাহার সমর্থকদের ক্যাপিটল হিলে হামলা, পরবর্তী সময়ে তাহার বিরুদ্ধে বিভিন্ন যৌন কেলেঙ্কারি ও ব্যাবসায়িক প্রতারণার অভিযোগ ইত্যাদি কারণে তাহার ভাবমূর্তি দেশে-বিদেশে যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ হয়। তবে এইবার যেমন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করিয়াছেন, তেমনি তাহার পূর্বের ভাবমূর্তি আর না বলিলেই চলে। বিশেষ করিয়া, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাহার যেই সকল প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাইতেছে তাহা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

সম্প্রতি ইরান-ইসরাইলের মধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরিয়া চলা যুদ্ধের অবসান হইয়াছে। যুদ্ধবিরতির কথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই প্রথম ঘোষণা করেন তাহার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইহা ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা। কেননা ইরান-ইসরাইলের হামলা-পালটা হামলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হইবার আশঙ্কা তৈরি হইয়াছিল। ইহাতে বিশ্বব্যাপী দেখা দেয় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। তবে হঠাৎ করিয়া ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় সমগ্র বিশ্বে নামিয়া আসে শান্তি ও স্বস্তি। ইহাতে মুহূর্তেই বিশ্বের স্টক মার্কেট ও তৈলের বাজার স্বাভাবিক হইয়া যায়। তাহার উদ্যোগে বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিন ধরিয়া চলা গাজা যুদ্ধও অবসানের পথে। এমনকি ইহার পূর্বে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধেও তাহার ভূমিকা ছিল অনন্য।

সাম্প্রতিক কালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বনেতার মতোই নিজেকে তুলিয়া ধরিতে সক্ষম হইয়াছেন। আমরা তাহার এই সকল শান্তিপূর্ণ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি, আগামী দিনে ট্রাম্প তাহার এই ইতিবাচক ভূমিকা অব্যাহত রাখিবেন। উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বার তাহার শপথ অনুষ্ঠানের ভাষণে বলেন, বিশ্বে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করিবেন। নির্বাচিত হওয়ার পর সেই উদ্যোগ লইয়াছেন এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের সহিত এখনো কূটনৈতিক চ্যানেলে আলাপ-আলোচনা চালাইয়া যাইতেছেন। তাহার এই উদ্যোগও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি। এই যুদ্ধ বন্ধ করিতে পারিলে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও পাইতে পারেন। কিছু দিন পূর্বে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন, 'পৃথিবীর যত যুদ্ধ তিনি থামাইয়াছেন, তাহার পরও নোবেল পান নাই। তিনি একাই চার-পাঁচটি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।' এখন ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধ করিতে পারিলে তিনি সেই পুরস্কার পাইয়া গেলে তাহাতে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। আসলে তাহার কৌশল ও পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি একজন মিস্ট্রিম্যান' বা রহস্য মানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছেন। মানুষ হিসাবে কেহই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নহেন। তবে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবদানকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

এই সংঘাতময় পৃথিবীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ইহার মধ্যে তিনি শান্তির জন্য যে অবদান রাখিয়া যাইতেছেন, তাহা কম কীসের? ট্রাম্পের এই নূতন দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল অনেককে বিস্মিত করিলেও, তাহার কার্যকারিতা লইয়া কোনো সন্দেহ নাই। পূর্ববর্তী আমলে তিনি যেই সকল বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য দ্বারা সংবাদের শিরোনাম হইতেন, এই বার তাহার স্থানে এক দৃঢ়চেতা, বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি দেখা যাইতেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক শান্তিই নহে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকেও বিপন্ন করিয়া তুলিয়াছিল। সেই জটিল প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা এবং ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্থাপন নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। গাজার বিষয়ে তাহার স্পষ্টবাদিতা, ইসরাইলের সমালোচনা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাহার পূর্বের কঠোর ভাবমূর্তি হইতে এক ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করিতেছে।

অনেকে মনে করেন, ট্রাম্পের এই 'হুমকি দাও, তাহার পর সমঝোতা করো' নীতি যদিও অস্বাভাবিক, তথাপি ইহা কার্যকর প্রমাণিত হইতেছে। কূটনীতির প্রথাগত পথ হইতে সরিয়া আসিয়া তিনি নিজস্ব এক পথ অবলম্বন করিয়াছেন, যাহা ফলপ্রসূ হইতেছে। ব্রিকস দেশগুলির উপর ১০ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধির হুমকি এবং পরবর্তী সময়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজিবার কৌশল তাহার এই নূতন দৃষ্টিভঙ্গিরই অংশ। এই সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি কেবল নিজ দেশের স্বার্থই নহে, বিশ্বশান্তির ধারণাকেও এক ভিন্ন মাত্রা দিতেছেন। অবশ্য, তাহার এই সকল উদ্যোগের গভীরে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিহিত আছে কি না, তাহা সময়ই বলিতে পারিবে। তবে, আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বে যেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়া আসিয়াছে, তাহার কৃতিত্ব তাহাকে দিতেই হইবে।