দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি, মানসম্পন্ন পাঠদানের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ার বিষয়টি সদ্য প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। এবার ১১ বোর্ডে মোট ৬ লাখ ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীর ভরাডুবি হয়েছে গণিতে।
এদিকে গণিতে ফেল বাড়ার পেছনে প্রধান একটি কারণ হলো, অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে গণিত দুর্বোধ্য। তাদের গণিত শেখানোর পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর। বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষকের গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। অর্থাত্ এবার ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব।
শিক্ষার্থীদের ‘গণিতভীতি’ না কাটার পেছনে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি ও শিক্ষাপদ্ধতিকে দায়ী করেছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দুই জন অধ্যাপক এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক দুই জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘মাধ্যমিক স্কুলের অনেক শিক্ষক এখনো শিক্ষার্থীদের গণিত মুখস্থ করান। ছাত্রছাত্রীদের তিনি সাজেশন দিয়ে দেন যে, এগুলো মুখস্থ করলে তুমি পাশ করে যাবে বা ভালো ফল করবে। ফলে তারা গণিত সমাধানে সক্ষম হয়ে ওঠে না। অর্থাত্ গণিতের মূল ধারণা ও ব্যাবহারিক প্রয়োগ বুঝতে পারে না। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ গণিতের থেকে কিছুটা হেরফের হলেই ভুল করে বসে। আর উত্তর মেলাতে পারে না। গণিতে এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে স্কুল পর্যায় থেকে গণিত সমাধানে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী হতে হবে। মুখস্থ করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো থেকে সংগ্রহ করা তথ্য নিয়ে ‘শিক্ষা পরিসংখ্যান’ প্রকাশ করে ব্যানবেইস। ঐ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মাধ্যমিকে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৩৬। অর্থাত্ মোট শিক্ষকের মাত্র ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন ৪ হাজার ৬৪৩ জন, যা মোট শিক্ষকের ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গণিতের শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাত্ গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক। ব্যানবেইস বলছে, ১৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বা ১২ হাজার ৯ জন গণিত শিক্ষক পদার্থ, রসায়ন ও গণিত-এ তিন বিষয়ের সমন্বয়ে বিএসসি করে এ বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৭৪৩ জন গণিত শিক্ষক অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে গণিত পড়ে বিএসসি করেছেন।
বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর গণিতে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, আর ইংরেজিতে ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশ। এছাড়া বাংলায় ৯৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, পদার্থবিজ্ঞানে ৯৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, রসায়নে ৯৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ৯৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, পৌরনীতিতে ৯৪ ও হিসাববিজ্ঞানে ৯১ দশমিক ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে। আবার গণিত ও ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে বরিশাল বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ গণিতে ও ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে। জানা গেছে, ১১ শিক্ষা বোর্ডে গণিতে গড়ে ফেল করেছে ২২.৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া ইংরেজিতে ১২ দশমিক ৭৯ শতাংশ, বাংলায় ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, পদার্থবিজ্ঞানে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, রসায়নে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ২ দশমিক ৭১ শতাংশ, পৌরনীতিতে ৬ শতাংশ ও হিসাববিজ্ঞানে ৮ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, গণিত নিয়ে এখনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি রয়ে গেছে। পাশাপাশি গণিত শিক্ষকের সংকট, মানসম্মত পাঠদানের অভাব এবং শুধু কোচিং ও গাইড নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণা গড়ে ওঠায় বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণিতভীতির সৃষ্টি হচ্ছে প্রাথমিক থেকেই :গণিতভীতি শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে যাচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। প্রাথমিক শেষ করেও গণিতের ন্যূনতম জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু। এজন্য শিক্ষকদের দক্ষতার অভাবকেই দুষছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণায়ও গণিত বিষয়ে পাঠদানে শিক্ষকদের দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য বলছে, পাঠদানের ক্ষেত্রে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষকের কাছেই গণিত একটি কঠিন বিষয়। এসব শিক্ষকের বড়ই অংশই গণিতের কিছু অধ্যায়কে দুর্বোধ্য মনে করেন। গণিত বিষয়ে পাঠদান সম্পর্কে জানতে ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ৪০০ শিক্ষক ও কর্মকর্তার ওপর একটি জরিপ চালায় নেপের গবেষক দল। জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে ‘ইফেকটিভনেস অব লেসন স্টাডি :এ কেস অব এনহ্যান্সিং কোয়ালিটি অব ম্যাথমেটিকস টিচিং লার্নিং ইন দ্য প্রাইমারি এডুকেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নেপ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টরসহ মোট ৪০০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা অংশ নেন। জরিপে অংশ নেওয়া সহকারী শিক্ষকদের ১৬ শতাংশ শূন্য থেকে পাঁচ বছর, ১৯ শতাংশ পাঁচ থেকে ১০ বছর, ৩৭ শতাংশ ১০ থেকে ১৫ বছর, ৯ শতাংশ ১৫ থেকে ২০ বছর এবং ১৯ শতাংশ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের শতভাগই গণিত বিষয়ে পাঠদানকে কঠিন বলে মত দেন। এছাড়া শিক্ষকদের কাছে গণিত বিষয়ে পাঠদানকে কঠিন অনুভূত হয় বলে মত দিয়েছেন ৭৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক। আর জরিপে অংশ নেওয়া সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টরদের শতভাগই বলেছেন, শিক্ষকরা গণিতে পাঠদানের ক্ষেত্রে ডিফিকাল্টি অনুভব করেন। শিক্ষাবিদরা বলেন, চিন্তাশক্তি ও যৌক্তিক ক্ষমতার বিকাশে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণিত। প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থায় এ বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। যদিও দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরের শিক্ষার্থীর মধ্যে একধরনের গণিতভীতি রয়েছে। বিশেষ করে, এ ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে প্রাথমিক থেকেই।
গণিতভীতি দূর করতে শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে শিক্ষাবিদরা বলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গণিতভীতি দূর করতে অনেক দেশ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ফিনল্যান্ড। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। এখানে কোনো আলাদা পরীক্ষা বা গ্রেডিং পদ্ধতি নেই। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে শেখে। গণিত তাদের কাছে আনন্দের একটি বিষয়। যুক্তরাজ্যে গণিত শেখানোর জন্য গেম-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যেমন—শিক্ষার্থীরা খেলতে খেলতে যোগ-বিয়োগ বা গুণ-ভাগ শেখে। এতে তারা গণিতকে মজার একটি খেলা হিসেবে গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্কুলে মন্টেসরি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এখানে গণিত শেখানোর জন্য বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে সংখ্যা গুনে শেখে। এতে তাদের মনে গণিতভীতি তৈরি হয় না।