ডেঙ্গু :আতঙ্ক নহে, সচেতনতা প্রয়োজন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণপিটুনি লইয়া আলোচনা এখন তুঙ্গে। ইহার পাশাপাশি রাজধানীতে বাড়বাড়ন্ত ডেঙ্গু জ্বর নূতন আতঙ্ক ছড়াইতেছে। যদিও চিকিত্সকরা জোর দিয়া বলিতেছেন যে, আতঙ্কের কিছু নাই, বরং সতর্কতা এবং সচেতনতা প্রয়োজন। তবে ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এক দিনে রেকর্ডসংখ্যক ৪৭৩ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা তিন-চার গুণ বেশি।

ঢাকায় ডেঙ্গু প্রথম থাবা হানিয়াছে প্রায় দুই দশক পূর্বে। তবে ডেঙ্গুর গতানুগতিক লক্ষণের চাইতে এইবারের লক্ষণগুলি অনেকটাই ব্যতিক্রম। আর এই কারণে আতঙ্কের কালোছায়া বিস্তার করিতেছে রাজধানীবাসীর মানসজগতে। আগে ডেঙ্গুর লক্ষণ ছিল জ্বর আর মাথাব্যথা। চোখের পেছনে ব্যথা হইত, গায়ে র্যাশ দেখা দিত। কিন্তু এইবারে কাহারো তীব্র পেটব্যথা হইতেছে, কাহারো হার্টের সমস্যা বাড়িয়া যাইতেছে, কাহারো মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়া ফেলিতেছে, যকৃত্ বড়ো হইয়া যাইতেছে কিংবা পানি জমিয়া যাইতেছে। যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের, সেই কারণে এই চারটি ভাইরাস একসঙ্গে প্রতিরোধে কাজ করে—এমন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয় নাই। অতএব ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের প্রধান কাজই হইল—অ্যাডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াইতে না পারে, তাহার ব্যবস্থা করা। কিন্তু তাহা কি সম্ভব হইতেছে? অনেকের মতে, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা রোধে জন্মানোর স্থান ধ্বংস এবং জাতীয়ভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। অভিজাত এলাকায় অ্যাডিস মশার প্রধান আবাস। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে অ্যাডিস মশার ডিম পাড়িবার উপযোগী স্থানগুলি পরিষ্কার রাখাটা নিশ্চিত করিতে পারিলে ডেঙ্গুর প্রকোপও নিশ্চিতভাবে হ্রাস পাইবে।

নূতন ধরন কেবল নহে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুর ঘটনাও এইবার বাড়িয়াছে। এইজন্য চিকিত্সকেরা জানাইয়াছেন যে, আতঙ্কিত না হইয়া জ্বর হইলেই চিকিত্সকের শরণাপন্ন হইতে হইবে। তাহা হইলে মৃত্যুঝুঁকিও কমিয়া আসিবে। প্রথমত, জ্বরটি ডেঙ্গু জ্বর কি না সেই বিষয়ে নিশ্চিত হইতে হইবে। দ্বিতীয়ত, সমস্যাটি জটিল আকার যাহাতে ধারণ করিতে না পারে তাহার জন্য চিকিত্সকদের নজরদারির মধ্যে থাকাটা জরুরি। সঠিক সময়ে ডেঙ্গু শনাক্ত হইলে এবং রোগীকে অযাচিত ও অযৌক্তিক ওষুধ প্রদান না করিলে ও রোগীকে বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় খাবার যেমন তরল, খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ খাবার-ফলের রস, লবণ, আইভি ফ্লুয়িড ইত্যাদি সেবন করিতে দিলে সাধারণভাবেই রোগী সুস্থ হইয়া যাইবে বলিয়া মনে করেন এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা। সুতরাং মশার জন্ম লইবার পরিবেশ বিনষ্টের পাশাপাশি আতঙ্কিত না হইয়া বরং সচেতন হইতে হইবে। অ্যাডিস মশা বৃদ্ধির স্থান ধ্বংস করিতে নাগরিকদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করিয়া সংক্রামক ব্যাধি আইন এবং সিটি করপোরেশন আইনের অধীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে। এই আইন অনুসারে যেই সকল ব্যক্তি নিজেদের বাড়ি পরিষ্কার করিতেছেন না, তাহাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। ইহার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করা জরুরি।