বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ বিমানের নিয়মিত উড্ডয়ন কোনো নূতন বিষয় নহে। তবে প্রশ্ন জাগে-জনবহুল রাজধানীর আকাশে কেন উড়িবে সলো ফ্লাইটের ঝুঁকিপূর্ণ বিমান? দেশে কি প্রশিক্ষণের জন্য জনবিরল অবারিত প্রান্তরের অভাব রহিয়াছে? স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ২৭টি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার কথা জানা গিয়াছে। এই যে এতগুলি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হইয়াছে-ইহা কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এক ধারাবাহিক অবহেলার ফসল? দেখা গিয়াছে-এই সকল দুর্ঘটনার অধিকাংশই সলো ফ্লাইট চলাকালে ঘটিয়াছে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণার্থীর একক নিয়ন্ত্রণে যাত্রাকালে যান্ত্রিক ত্রুটি বা মানবিক ভ্রান্তির সম্ভাবনা প্রকট হয়। সুতরাং প্রশ্ন জাগে, উড্ডয়নের পূর্বে উক্ত বিমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও চালকের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গরূপে যাচাই করা হইয়াছিল কি না? বাংলাদেশের ভূগোল জনবিরল প্রশিক্ষণ আকাশসীমা নির্ধারণের যথেষ্ট সুযোগ দিয়াছে-বরিশাল, রাজশাহী, সৈয়দপুর, জনবিরল নদনদী কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃত অঞ্চল রহিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও কেন জনবহুল রাজধানীর সীমিত ও জটবদ্ধ আকাশই প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হইয়া থাকিয়া গেল? বিমান প্রশিক্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয় লইয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি যথাযথ জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন? অতএব, এই দুর্ঘটনা কেবল একটি সামরিক প্রশিক্ষণ বিমানের পতন নহে; ইহা জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং জবাবদিহির বিষয়গুলি প্রশ্নের মুখোমুখি করিতেছে। এখন প্রয়োজন-প্রশিক্ষণ নীতির রূপান্তর, সলো ফ্লাইটের প্রোটোকলের কঠোর পর্যালোচনা এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তাকে সামরিক 'সার্ভেইলেন্স'-এর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
দুঃখজনকভাবে, দুর্ঘটনার পরে ঘটিয়াছে আরেকটি ট্র্যাজেডি। ভিড় ও যানজটের কারণে সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাইতে পারে নাই। যন্ত্রপাতি, অক্সিজেন কিংবা প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে অনেকেই হয়তো অল্পের জন্য বাঁচিতে পারিল না। ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী। এমন বাস্তবতায়, জনজটে আটকা পড়া জরুরি সেবা যেন এক নিরবচ্ছিন্ন নিয়তির পরিহাস। ইহা কেবল প্রযুক্তিগত নহে-একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাও বটে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প পথনির্দেশনা এবং উদ্ধার ব্যবস্থার পূর্বপ্রস্তুতি কেবল উন্নত রাষ্ট্রে নহে-এই মহানগরেও সময়ের দাবি।
বিমান দুর্ঘটনার পরে সেনাবাহিনী দুর্ঘটনাস্থল 'কর্ডন' করিয়া লইয়া লয়। যদিও সামরিক সম্পদের সুরক্ষার্থে ইহা একটি স্বাভাবিক পদক্ষেপ, তথাপি যখন স্কুল ভবনের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী আটকা পড়িয়া থাকেন এবং আহতদের খবর জানিবার জন্য অভিভাবক ও সহপাঠীরা উতলা হইয়া পড়ে, তখন তথ্য গোপনের অভিযোগ এবং ক্ষোভ মাথাচাড়া দিতেই পারে। সেনা কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে প্রত্যাশিত ছিল-তৎপর ও স্বচ্ছ হস্তক্ষেপ, আহত ও নিহতের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং মানবিক আচরণ। আমরা দেখিয়াছি, উক্ত ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মধ্যরাতের বিক্ষোভ এবং ছয় দফা দাবির ঘোষণা দিয়াছে। তাহারা কেবল নিহত সহপাঠীর জন্য কাঁদে নাই, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়দায়িত্ব লইয়াও প্রশ্ন তুলিয়াছে। বিশেষভাবে, পুরাতন যুদ্ধবিমান বাতিল করা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থানান্তর এবং নিরাপদ ও দূরবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণের দাবি এই তরুণদের প্রাজ্ঞতার সাক্ষ্য দেয়।
আরো একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আমাদের মনে গুঞ্জরিত হইতেছে। এই যন্ত্রণাময় ঘটনার পরে নিহতদের পরিবারকে রাষ্ট্র কী ক্ষতিপূরণ দিবে? যদিও, যেই অমূল্য প্রাণ ঝরিয়া গিয়াছে, কোনোভাবে তাহার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সম্ভব নহে। তাহার পরও উপমহাদেশে প্রচলিত রহিয়াছে দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনার শিকার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের। সুতরাং এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলিকে সরকার কী ধরনের ক্ষতিপূরণ দিবে-তাহাও স্পষ্ট করা উচিত।
বলা যায়, এই দুর্ঘটনা আমাদের মনে বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তা ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন উসকাইয়া দেয়। জনবহুল নগরে প্রশিক্ষণ, জরুরি সেবায় দেরি, তথ্য গোপনের অভিযোগ এবং দায় এড়ানো-এই সকল প্রবণতার বিপরীতে জনক্ষোভ মাথাচাড়া দিতেছে। এই জনক্ষোভ নূতন বার্তা দিতেছে। আমরা কি সেই বার্তা পড়িতে পারিতেছি?