মুন্সীগঞ্জে বাড়তি টাকা ছাড়া মেলে না জমির পর্চা!

সরকার ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু করলেও এখনো তা শতভাগ সফল হয়নি মুন্সীগঞ্জে। অনলাইনে এখনো জমির পর্চা পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া জমি বেচাকেনার পর রেজিস্ট্রি হলেও জমির দলিল হাতে পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যাচ্ছে। তবে সেবাগ্রহীতার জন্য করা ফ্রন্ট ডেক্স বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস নামের দৃষ্টিনন্দন অফিস-সেবা চালু হওয়ায় এবং একই সঙ্গে ভূমি অফিসগুলোতে সেবা নিতে আসা জনসাধারণের বসার জন্য বিশেষ ঘরের ব্যবস্থা করায় লোকজন অন্তত কিছুটা আরামে বসে কাজ করতে পারছেন। প্রতিটি উপজেলায় ভূমি অফিসগুলো আধুনিকায়ন হয়েছে।

একসময়ের হিন্দু অধ্যুষিত মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরে জমিসংক্রান্ত নানান জটিলতা রয়েছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা হয়ে থাকে হরহামেশাই। তবে মামলা করার আগে লোকজনকে সমস্যায় পড়তে হয় জমির পর্চার জন্য। সংশ্লিষ্ট ইউপি ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা নকল শাখা ও আদালত শাখায় জমির পর্চা পাওয়া গেলেও একমাত্র জেলা নকল শাখার পর্চাই আদালত গ্রহণ করে থাকে। কারণ এখান থেকে সার্টিফায়েড পর্চা দেওয়া হয়। আর এই সার্টিফায়েড পর্চা পেতেই যত সমস্যায় পড়তে হয় লোকজনকে। তাছাড়া জমি কেনাবেচা ও নামজারির ক্ষেত্রেও সার্টিফায়েড পর্চার প্রয়োজন হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একটি পর্চার জন্য ৩৫ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে জেলা নকল শাখার ফ্রন্ট ডেক্সে আবেদন করতে হয়। সেখান থেকে ৫-১০ দিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয় পর্চা গ্রহণের জন্য। ফ্রন্ট ডেক্স আবেদনটি নির্দিষ্ট শাখায় পাঠিয়ে দেয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখে গিয়ে সেবাগ্রহীতা বা আবেদনকারী পর্চাটি পান না—এমন শত শত অভিযোগ রয়েছে। ডেলিভারি নিতে সেবাগ্রহীতাকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় নকল শাখার পর্চার জন্য। এতে কখনো কখনো কয়েক মাস পার হয়ে যায় নির্দিষ্ট পর্চাটি হাতে পেতে। টাকা না দিলে এখানে সহজে পর্চা পাওয়া যায় না। তবে এখানে একশ্রেণির দালাল রয়েছে। তাদের ৫০০ টাকা দিলে দুই-তিন দিনের মধ্যেই পর্চা হাতে পাওয়া যায়। জেলার ওই নকল শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিটি উপজেলায় তত্পর রয়েছে দালাল চক্র। তারা প্রতিটি পর্চার জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে দ্রুতই পর্চা পাইয়ে দিচ্ছে লোকজনকে। জেলা নকল শাখায় না গিয়ে ঝামেলামুক্তভাবে উপজেলা থেকেই দালালের মাধ্যমে পর্চা পেয়ে খুশি তারা। কিন্তু দরিদ্র লোকজনের সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যারা ফ্রন্ট ডেক্সে আবেদন করেছেন, দালাল চক্রের কারণে তাদের কাজ ঝুলে যাচ্ছে। দিনের পর দিন তারা নকল শাখায় দৌড়ালেও পর্চার অভাবে মামলা করতে পারছেন না বা জমি কেনাবেচা করতে পারছেন না। অনেক সময় পর্চার অভাবে যথাসময়ে মামলা করতে না পারায় জমি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। অবৈধভাবে সেই জমি দখল করে নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। তাছাড়া জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করতে চাইলেও এই পর্চার অভাবে জমি রেজিস্ট্রি করতে না পারায় সমস্যায় পড়ছেন লোকজন।

এদিকে অনলাইন বা ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে এখনো হয়নি জমির নামজারি বেচাকেনা ও পর্চা সার্ভিস। প্রতিটি জমি বেচাকেনার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে ওয়েবসাইটে নতুন মালিকের নাম পাওয়ার কথা থাকলেও এখনো সেটি হয়নি। যথাযথ ফি দিয়ে জমির পর্চা অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি মুন্সীগঞ্জে। অন্যদিকে জমির নামজারির ক্ষেত্রে সরকারি ফি ১ হাজার ২০০ টাকা হলেও জমি ক্রেতার ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কারণে সেবাগ্রহীতাকে এই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়।

এ প্রসঙ্গে নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, ‘অনলাইনে আবেদন করলে সাধারণত সাত দিনের মধ্যে জমির পর্চা দেওয়া হয়। জরুরি ক্ষেত্রে চার দিন। তবে যেহেতু সার্টিফায়েড কপি দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে স্বাক্ষরসহ নানা কারণে দুই-চার দিন বেশি সময় লাগতে পারে। তবে এটি যাতে যথাসময়ে পাওয়া যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি মাসখানেকের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হবে। তবে ফ্রন্ট ডেস্কে যদি কারো পর্চা পেতে দীর্ঘ সময় ঘুরতে হয়, সেক্ষেত্রে কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে আমি ব্যবস্থা নেব। তাছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ওয়েবসাইটের  কাজ চলছে। তাই প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি সঠিকভাবে পাওয়া যাবে না। আর নামজারির ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’