উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতিবিদরা উপদেশ দেওয়ার জন্য খ্যাতি অর্জন করিয়া চলিয়াছেন। তাহারা যতটা না কাজ করেন, তাহার চাইতে উপদেশ অধিক দিয়া থাকেন বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি কত বিচিত্র বিষয়ে যে তাহারা প্রতিদিন নসিহত দিয়া চলিয়াছেন তাহার ইয়ত্তা নাই; কিন্তু কার্যত এই সকল ক্ষেত্রে তেমন উন্নতি লাভ করিতে কি দেখা যায়? অথচ দেশ ও দশের উন্নয়নে রাজনীতিবিদদের কাজের মাধ্যমে গার্ডিয়ান অব ন্যাশন বা জাতির অভিভাবক হইয়া উঠিতে হয়; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ কথায় যতটা পটু, অথচ কাজে ঠনঠন। তাহারা নিজের কাজ যেমন করেন না, তেমনি অন্যের কাজও করেন না।
ইহার ফলে এই সকল হতভাগ্য দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ব্যাহত হইতেছে। মনে রাখিতে হইবে, কেবল বাগাড়ম্বর দ্বারা কোনো জাতি উন্নতি লাভ করিতে পারে না। যখন কর্মের পরিবর্তে কেবল বাক্যব্যয় প্রধান হইয়া উঠে, তখন জনমনে হতাশা ও অবিশ্বাস দানা বাঁধিতে থাকে। জনগণ তাহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট হইতে কেবল প্রতিশ্রুতি শুনিতে শুনিতে ক্লান্ত হইয়া পড়ে। বাস্তবায়নের অভাব সমাজে এক প্রকার স্থবিরতা চলিয়া আসে। যুবসমাজ দেখিতে পায় যে, মেধা ও শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন হইতেছে না, বরং চাটুকারিতা ও মূর্খতাই সাফল্যের সোপান। এই কারণে অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তি দেশ ত্যাগ করিয়া উন্নততর সুযোগের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাইতেছেন, যাহা দেশের জন্য এক বিরাট ক্ষতি। তাই রাজনীতিবিদদের প্রধান দায়িত্ব হইল দেশের সমস্যাগুলি চিহ্নিত করিয়া তাহার বাস্তবসম্মত সমাধানসূত্র বাহির করা এবং তাহা কার্যকর করা। কেবল সভা-সমিতিতে বড় বড় বক্তৃতা প্রদান করিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। উন্নয়ন কেবল কাগজে কলমে বা বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকিলে চলিবে না; তাহা বাস্তবে পরিলক্ষিত হইতে হইবে। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা-এই সকলই কাজের মাধ্যমে সম্পন্ন করিতে হয়। দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা। যখন একজন রাজনীতিবিদ নিজের হাতে কাজ করেন, জনগণের সহিত সরাসরি মিশিয়া তাহাদের সমস্যাগুলি অনুধাবন করেন এবং তাহার সমাধানে ব্রতী হন, তখনই তিনি প্রকৃত অর্থে জননেতা হইয়া উঠেন। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তাহাদের উপর, যাহারা কেবল স্বপ্ন দেখান না, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করিতে পারেন।
কবি কুসুমকুমারী দাশের 'আদর্শ ছেলে' কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন এইখানে উল্লেখ না করিলেই নহে। তিনি শুরুতেই লিখিয়াছেন- 'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?' অর্থাৎ দেশের সন্তানগণ কেবল বাক্যবাগীশ না হইয়া কর্মবীর হইয়া নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করিবেন। ইহা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মাপকাঠি নহে, ইহা একটি জাতির সামগ্রিক উন্নতির মূলমন্ত্র। আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায়, যাহারা মুখে বড় বড় কথা বলেন, সুমধুর বক্তৃতা দেন, তাহারাই অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন; কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আনয়নকারী শক্তি হইল কর্ম। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এই উক্তিটি আরো অধিক প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাহাদের প্রতিটি কথা ও কর্মের উপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। যদি তাহারা কেবল কথার ফুলঝুরি ছড়ান এবং বাস্তব কর্মে উদাসীন থাকেন, তাহা হইলে জাতির অগ্রগতি অসম্ভব হইয়া পড়ে। এই জন্য এই সকল দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শৈশবকাল হইতেই কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও হাতেকলমে কাজ করিবার মানসিকতা তৈরিতে জোর দিতে হইবে। কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নহে, ব্যাবহারিক দক্ষতা অর্জনের উপরও গুরুত্ব দিতে হইবে। আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে কেবল বাগাড়ম্বর পরিহার করিয়া বাস্তবমুখী ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি করিতে হইবে। ইহার সহিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তাহাদের প্রতিশ্রুত কর্মের জন্য জনগণের নিকট জবাবদিহি করিতে বাধ্য করিবার একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। এই জন্য সাধারণ জনগণকেও সচেতন হইতে হইবে।