নিত্যপণ্যের মতো ধীরে ধীরে বই-খাতা, স্কুলের পোশাক-ব্যাগসহ সিংহভাগ শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ১২৮ পৃষ্ঠার একটি খাতার দাম এখন মানভেদে ৫০ থেকে ৭৫ টাকা। অথচ পাঁচ বছর আগেও ৩০ টাকায় পাওয়া যেত। ২০০ পৃষ্ঠার খাতার দাম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ৩০০ পৃষ্ঠার খাতা আগে ছিল ৮০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। বেড়েছে স্কুলের পোশাক ও স্কুলব্যাগের দাম।
স্কুলের টিউশন ফিও বেড়েছে। এতে সন্তানদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা। তার ওপর ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে হাজির হয়েছে কোচিং। কোচিং নীতিমালার দোহাই দিয়ে স্কুলেও বাধ্যতামূলকভাবে আয়োজন করছে কোচিংয়ের। অনেকে স্কুলেই অতিরিক্ত ক্লাসের নাম দিয়ে এই কোচিং করানো হচ্ছে। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোর পাশাপাশি সরকারি স্কুলের চিত্রও অভিন্ন।
এতে একজন শিক্ষার্থী এই কোচিং করতে সম্মত হোক আর না হোক, তাকে নির্দিষ্ট ফি দিতেই হবে। এমনকি অভিভাবকদের কোচিং করানোর অনুরোধ-সংবলিত একটি আবেদনও জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর কোনো অভিভাবক এই আবেদন জমা না দিলে তার সন্তানকে রীতিমতো হেনস্তা করা হচ্ছে। অঙ্ক, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের শিক্ষকের কাছে স্কুল কিংবা বাইরে কোচিং না করালে শিক্ষার্থীদের কম নম্বর বা ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। এমনকি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।
রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন আজিজুল হক। দুই ছেলে, মা ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। ছেলে দুইটিকে ভর্তি করেছেন মোহাম্মদপুরে একটি স্কুলে। প্রথম ছেলে এবার নবম শ্রেণিতে, আর দ্বিতীয়টি পঞ্চম শ্রেণিতে। আজিজুল হকের বেতন ৩৫ হাজার টাকা। আজিজুল হক বলেন, ‘দুই জনের স্কুলের বেতন ৪ হাজার টাকার মতো। স্কুলের ক্লাসে তো তেমন পড়ানো হয় না। আলাদাভাবে তাদের উভয়েরই দুইটি করে প্রাইভেট পড়তে হয়। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয় না পড়লে হয় না।
স্কুলে তো শুধু পড়া দেয় আর নেয়। মাসে প্রাইভেটে খরচ হয়ে যায় প্রায় ১০ হাজার টাকা। আর দুই জনের যাতায়াত, টিফিন আর খাতা, কলমসহ আনুষঙ্গিক শিক্ষা উপকরণে আরো প্রায় ৪ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দুই সন্তানের পড়ালেখার পেছনেই খরচ হয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এরপর বাসা ভাড়া দিলে অবশিষ্ট আর কিছু থাকে না।’ সন্তানের শিক্ষার খরচ মিটিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন আজিজুল হক। তাকে বছরে চার বার কিনতে হয় ১৪টি খাতার সেট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা নিষিদ্ধ করে ২০১২ সালে ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা’ জারি করে সরকার। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ১০ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন। তবে ঐ শিক্ষার্থীদের নাম, রোল ও শ্রেণি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানাতে হবে। এ নীতিমালা রাজধানীসহ দেশের কোথাও মানা হচ্ছে না। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে শ্রেণিকক্ষেই চলে কোচিং বাণিজ্য। গত ২১ জুলাই বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রায় ১০ মিনিট আগেই মাইলস্টোন স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বেজেছিল। কিন্তু দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কাছে কোচিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী, আহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাসরুমে কোচিং ক্লাস করে আসছেন একশ্রেণির শিক্ষক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি আইন উপেক্ষা করে নিজেদের মতো নতুন আইন করেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এখনকার শিক্ষকদের বাসায় কিংবা অন্য কোথায় কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে শিক্ষকরা চাইলে বিদ্যালয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারেন। মাইলস্টোনের সবগুলো শাখা একই নিয়মে পরিচালিত হয়। মাইলস্টোনে স্কুল পর্যায়ে ছুটি হয় বেলা ১টার দিকে। আর কলেজ পর্যায়ে ছুটি হয় ১টা ৪০ মিনিটে। স্কুলের কোচিং শুরু হয় দেড়টায় আর কলেজের ২টা থেকে। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন আহত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার ভাতিজা কোচিং করতে অপেক্ষা করছিল। ওর ছুটি হয়েছিল ১টায়। তবে শিক্ষকরা স্কুলে কোচিং নেওয়ায় সে ভেতরেই ছিল।’ প্রসঙ্গত, গত ১১ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশ বলা হয়েছে, সারা দেশে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস শেষে ছুটির পর এবং বন্ধের দিনে শ্রেণিকক্ষে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং করানো যাবে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আইনে নিষিদ্ধ থাকলেও রাজধানীতে চলছে শিক্ষকদের সহস্রাধিক কোচিং সেন্টার। অধিকাংশ কোচিং সেন্টারে ব্যাচে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের মূল ক্যাম্পাস, শাখা ক্যাম্পাসগুলোর আশপাশে হাঁটলে কোচিং সেন্টারের অসংখ্য সাইনবোর্ড চোখে পড়ে, যেগুলো ঐসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা চালান। রাজধানীর শাহজাহানপুরে রয়েছে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের অনেক কোচিং সেন্টার। উত্তরা ব্যাংকের গলিসংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে উঠেছে স্কুলের বিকল্প; অনেকের কাছে শ্রেণিকক্ষের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে কয়েক শতাধিক কোচিং সেন্টার। আইডিয়াল স্কুলের মতিঝিল ও মুগদা শাখা, মতিঝিল সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো নামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরই এসব কোচিং সেন্টারে বেশি আসতে দেখা যায়। পড়াচ্ছেনও এসব শিক্ষালয়ের শিক্ষকরা। তারা এককভাবে অথবা কয়েক জন মিলে গড়ে তুলেছেন কোচিং সেন্টার। মিরপুরের মনিপুর স্কুলের শেওড়াপাড়া, ইব্রাহীমপুর ও রূপনগর শাখার চারপাশে কোচিং সেন্টারের ছড়াছড়ি। রূপনগরে ‘চারুপাঠ’ নামের একটি কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে মনিপুর স্কুলের ব্রাঞ্চ-১ থেকে, যা কয়েক শ গজের মধ্যে। এই স্কুলেরই কয়েক শিক্ষক কোচিং সেন্টারটি চালান বলে জানা যায়।