আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এড়িয়ে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বাড়বে না

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশ সে সুযোগ নিতে পারছে না। বরং গত কয়েক বছর ধরে এ খাতের রপ্তানি কমতির দিকে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এড়িয়ে এ খাতের রপ্তানি বাড়বে না। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এ মত দেন। তারা বলেন, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তর হলেও বর্জ্য শোধন বিশ্বমানের হয়নি। গার্মেন্টস খাতের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত সনদের স্বীকৃতি থাকলে এ খাতেও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা তৈরি হবে। ‘চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকায় ট্যানারি কারখানায় চামড়া উত্পাদন পরিস্থিতি ও টেকসই উন্নয়নে প্রস্তাবনা’ শীর্ষক ঐ সেমিনারের আয়োজন করে যৌথভাবে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লেদার সেক্টর বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ইটিপি ব্যবস্থাপনায় নতুন যে উদ্যোগ (কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনা) নেওয়া হয়েছে, তা একেবারেই নতুন। এ কার্যক্রম এককভাবে শুরু না করে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সহযোগিতায়, তাদের ব্যবস্থাপনায় করা হলে ব্র্যান্ডদের আস্থা বাড়বে।

ট্যানারির পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহমেদ বলেন, পরিদর্শনে গেলে ক্রোম রিকভারি (বর্জ্য) ইউনিট বন্ধ পাওয়া যায়। ট্যানারি বর্জ্য নদীতে ফেলা, বিভিন্ন পচনশীল বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা, কঠিন বর্জ্যের সার্বিক ব্যবস্থাপনা না হওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখতে হয়। বিদেশি সংস্থাগুলোকে সবসময় জবাব দিতে হয়। তারা পরোক্ষ হুমকিও দেয়।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, চামড়া শিল্পখাতে শতকরা ৬০ ভাগ মূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকলেও দেশীয় চামড়াজাত পণ্যের অনুকূলে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের ছাড়পত্র না থাকায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। এ সনদ অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সিইটিপি (কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার) পূর্ণমাত্রায় সচল করা, ট্যানারি মালিকদের জন্য বরাদ্দকৃত প্লট নিবন্ধন দেওয়া, কেমিক্যাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া, কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে ট্যানারি মালিকদের ৫ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান, ট্যানারি শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিতকরণ, বর্জ্য পরিশোধন এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।

বেঙ্গল লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিএফএলএলএফইএ’র সাবেক সভাপতি টিপু সুলতান সেমিনার শেষে ইত্তেফাককে বলেন, ইটিপি সম্পন্ন না হওয়ায় পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স সনদ পাচ্ছি না। ফলে আন্তর্জাতিক নামকরা আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্য নিচ্ছে না। তিনি বলেন, চার বছর আগে ২৪০ কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করলেও এখন তা মাত্র ৪০ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এটি গঠন করা হবে। তিনি জানান, এ টাস্কফোর্স প্রতি সপ্তাহে চামড়া শিল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি অচিরেই বিদ্যমান ১২০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে দুই বছরে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে।

এ সময় জানানো হয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার ২২০ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ০.৫০ শতাংশ।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদের সভাতিত্বে এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদ, বিডার নির্বাহী পরিচালক কাজী এম আমিনুল ইসলাম, শিল্প সচিব মো. আব্দুল হালিম, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।