চলচ্চিত্রের আগামী নেতাদের সমীপে

আগামীকাল প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির নির্বাচন। প্রায়শই চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট অনেক বিজ্ঞজনকে বলতে শোনা যায় যে চলচ্চিত্র জগতের বড়ো এই সংগঠনের দীর্ঘদিন ধরে না হতে পারা নির্বাচনের কারণে চলচ্চিত্রের জন্য কোনো কাজ করা যায়নি এবং কার্যত কোনো কাজ হয়নি প্রয়োজনীয় নেতার অভাবে।

আশা করি এবার আমাদের চলচ্চিত্রের বড়ো সংগঠনটির সেই সব প্রয়োজনীয় বিজ্ঞ নেতার অভাব পূরণ হবে এবং প্রযোজক সমিতির এই নির্বাচনের পর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে আমাদের চলচ্চিত্র। যারা বিজ্ঞ নেতা হয়ে আসবেন, তাদের কাছে এমনই প্রত্যাশা আমাদের। সময়োপযোগী ব্যবসা প্রদানকারী চলচ্চিত্র যেমন তাদের কাছে মাতৃসুলভ আচরণ পাবে, তেমনি আশা করব যে চলচ্চিত্র শিল্পসঞ্জাত, সেটি যেন তাদের কাছে বিমাতাসুলভ আচরণ না পায়। কে জানে, হয়তো এদের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে আরেকজন জহির রায়হান! জহির রায়হানের ‘কখনও আসেনি’ ছবিটি তত্কালীন সময়ে আর্থিকভাবে ব্যর্থ একটি ছবি। অথচ তারই হাতে নির্মিত হয়েছে ‘জীবন থেকে নেয়া’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র এবং আমজাদ হোসেন ও কাজী হায়াতের মতো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অন্যতম নির্মাতারা। তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বার্থে এসব চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও তাদের চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। শুধু টাকা রোজগার করতে পারলেই যেমন সে ভালো ছেলে হয় না, তেমনি টাকা রোজগার করতে না পারলেই সেটা ব্যর্থ ছবি হয় না। ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘নোয়াখাইল্যা মাইয়া বরিশাইল্যা পোলা’ বা ‘পাসওয়ার্ড’-এর মতো তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি রাজীবুল হাসানের ‘হূদয়ের রংধনু’ বা তাপস কুমারের ‘অনুপ্রবেশ’-এরও প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বার্থে নতুন নেতারাও এটা বুঝবেন আশা করি। তরুণ ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা অনেক বাধা ডিঙিয়ে একটি ছবি তৈরি করেন। রাজীবুল হাসান তার ‘হূদয়ের রঙধনু’ নিয়ে কখনো পাহাড়ে লোকারণ্যে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনী করে যাচ্ছেন। স্বাধীন নির্মাতারা তাদের সিনেমাটা সবাইকে দেখাতে চান। এমন আরো অনেক চলচ্চিত্রকারই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন নিভৃত অভিমানে একা একা। তারা একইসঙ্গে একা এবং অনেক।  ‘অনুপ্রবেশ’-এর নির্মাতা তাপস কুমার এবং ‘হূদয়ের রংধনু’র রাজীবুল হাসানকে চলচ্চিত্র নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে কাছে থেকে দেখেছি বলে বলতে পারছি। এমনভাবে সংগ্রামমুখর চলচ্চিত্র জীবন বেছে নিয়ে অনেক তরুণ আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করছেন, যাদের মধ্যে মাহমুদ দিদারের ‘বিউটি সার্কাস’ নিয়ে করতে থাকা সংগ্রাম উল্লেখযোগ্য। অং রাখাইনকে তার ‘মাই বাইসেকল’ নিয়ে যেভাবে বাধা পেতে হয়েছে, তা যেন পেতে না হয়—এ বিষয়ে আমাদের আগামীর চলচ্চিত্র নেতাদের কাছে সহমর্মিতা আশা করব। সামুরাই মারুফ যেভাবে তার ‘পারলে ঠ্যাকা’ ছবিটি নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন, ঠিক সেভাবেই যেন সবার অগোচরে হারিয়ে গেলেন; নতুন কোনো চিত্রনির্মাতার যেন এমন পরিণতি না হয়, সে বিষয়ে কিছু করার জন্য বিজ্ঞ নেতাদের অনুরোধ করব।

চলচ্চিত্র তৈরিকালীন শিল্পী-কলাকুশলীদের অসহযোগিতা বা ছবি মুক্তির পর প্রযোজকের অর্থপ্রাপ্তির গ্যাঁড়াকলের বিলুপ্তিতে প্রযোজক নেতারা কাজ করবেন বলে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই এ বিষয়ে কিছু না বলে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের ভবিষ্যত্ নেতাদের অনুরোধ করব—ছবি রিলিজের পর অনেক সময়ই দেখা যায় যে বিভিন্ন কারসাজি করে ছবিটি হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রযোজকরাই এই ক্ষতিটার বেশি শিকার হন। যদি প্রদর্শকদের বোঝানো যায় যে প্রযোজকরা আলু-পটোলের ব্যবসা করতে তো আসেননি যে পটোল পচে গেলেই তা ফেলে দিতে হবে! রমরমিয়ে ব্যবসা অনেক বড়ো বড়ো চলচ্চিত্রকারের ছবিতেও হয়নি। তারপর তারা এমন সব ছবি বানিয়েছেন, যা সমাজকে নাড়িয়ে তো দিয়েছেনই, সেইসঙ্গে ছবি বানানোর প্রক্রিয়াটাকেই পালটে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে চার্লি চ্যাপলিন, সত্যজিত্ রায়, জহির রায়হান ও তারেক মাসুদের নাম উল্লেখযোগ্য।

উচ্চতর শিল্পের কদর সব সমাজে সব সময় বিরল, এজন্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। সমাজ ও মননশীলতাকে উন্নত করতে সিনেমা যে ভূমিকা রাখে, সে কাজে হলের মালিকদেরও অবদান থাকা দরকার। এ ব্যাপারটা হলের মালিকদের বোঝাতে পারেন আমাদের বিজ্ঞ নেতারা, কারণ তারাই আমাদের কান্ডারি। নইলে ভিনদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির অতিপ্রচারে, ভোররাত থেকে হলের সামনে টিকিট কাটার জন্য লাইন থাকবে, ব্যবসা হবে। কিন্তু ভিন্ন দেশের বিভিন্ন সব অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণে নয়ন বন্ডদের মতো অমানুষে ভরে যাবে এই সমাজ। আক্রান্ত হবো আমি, আপনি, আমরা। তখন?

n লেখক :স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা