ছাত্র-জনতার জুলাইয়ের গণআন্দোলন দমাতে ব্যবহার করা হয় প্রাণঘাতী অস্ত্রের। এতে হতাহত হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ। যারা প্রাণে বেঁচে যান তাদের কেউ পা, কেউ হারিয়েছেন চোখ। কেউ বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আজীবনের জন্য। কারো শরীরে রয়ে গেছে এখনো গুলি। পুলিশের গুলিতে গুরুতর জখম হওয়া এরকম দুজন ব্যক্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। চেয়েছেন ন্যায় বিচার। সঠিক বিচার হলে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাক্ষীরা। সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মূর্তজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন তারা। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও জজ মো. মহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গত বছরের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে আহত হন পারভীন (২৭) নামে এক নারী। আহত এক যুবককে উদ্ধার করতে গেলে যাত্রবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে এসে তার চোখ ও শরীর লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে দুই দফা অপারেশন করে বের করা হয় কয়েকটি গুলি। এখনো কিছু গুলি তার শরীরে রয়ে গেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে পারভীন তার সাক্ষ্যে বলেন, আমার দুটি সন্তান রয়েছে। আমার সন্তানদের কে দেখবে? হাজার হাজার শহিদ ও আহতদের এবং আমার অন্ধত্বের বিচার চাই। এই সরকারের সময়ে অন্যায়ের সঠিক বিচার না হলে ভবিষ্যতে যেসব সরকার আসবে তারাও একইভাবে মানুষ হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করবে না। মনে মনে ভাববে হত্যার বিচার তো হয় না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ছিল পুলিশের বাপ-মা। তার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, আহত হয়েছে। তার নির্দেশ ছাড়া পুলিশ এভাবে গুলি করতে পারে না। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর এম তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, এ বি এম সুলতান মাহমুদ প্রমুখ।
‘নো রিলিজ-নো ট্রিটমেন্ট’-এর নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা
এর আগে সাক্ষ্য দেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল ইমরান।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণআন্দোলনে শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯ জুলাই বিজয়নগর পানির ট্যাংক এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় আমাদের ওপর গুলি করে পুলিশ। গুলি এসে আমার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে লাগে। পাশেই আরো দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমার পা চামড়ার সঙ্গে ঝুলে ছিল। সেখান থেকে প্রথমে মিটফোর্ড এবং পরে নিটোর পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। ঐ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় ২৬/২৭ জুলাইয়ের দিকে সেখানে পরিদর্শনে আসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিদর্শনের একপর্যায়ে আমার বেডের কাছে এসে আমার সঙ্গে কথা বলেন। তখন আমি বলি, ‘পুলিশ আমাকে সরাসরি গুলি করেছে।’ আমার পরে আরো চার/পাঁচ জনের সঙ্গে উনি কথা বলেন। যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন হেল্প ডেস্কের কাছে গিয়ে উনি ‘নো রিলিজ-নো ট্রিটমেন্ট’-এর অর্ডার দিয়ে যান। যা আমি শুনতে পাই। পরবর্তীকালে বুঝতে পারি, আমার যে ধরনের চিকিৎসা পাওয়ার দরকার ছিল সেটা পাই নাই। পরে পায়ের অবস্থা আরো খারাপ হলে আমার বাবা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমাকে রিলিজ দেওয়া হয়নি। তখন আমি বুঝতে পারি শেখ হাসিনার ‘নো রিলিজ-নো ট্রিটমেন্ট’-এর বিষয়টি।
সাক্ষী ইমরান বলেন, ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে ও পরে আমার পায়ে ২৫টি অপারেশন হয়েছে। এ জীবনে আর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। আমার এই পরিণতির জন্য শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন দায়ী। এদের দায়ী করার কারণ হলো পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তা বাস্তবায়ন করেছেন অপর দুই আসামি। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে তাদের জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মো. আমির হোসেন। আসামির কাঠগড়ায় ছিলেন আসামি মামুন।