নওগাঁর সাপাহারে পুকুরের পানিতে ডুবে গত ১৪ জুলাই আশিক নামে এক বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়। দুপুরে সবার অজান্তে বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছিল আশিক। তার মতো প্রতিদিন ৪০টির বেশি শিশুর মৃত্যু হয় পানিতে পড়ে। প্রতি ৩০ মিনিটে মৃত্যু হচ্ছে একটি শিশুর। পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যুর ৮০ ভাগই ঘটে বাড়ি থেকে ২০ মিটারের মধ্যের পুকুরে পড়ে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। পুরো দেশে পানিতে ডুবে যত শিশু মারা যায়, তার তিনগুণ বেশি শিশু মারা যায় বরিশাল বিভাগে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের সঠিক তত্ত্বাবধানে রাখতে পারলে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদের সাঁতার শেখানো গেলে এবং সমাজে জনসচেতনতা তৈরি করতে পারলে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু অনেকাংশে কমে আসবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পানিতে ডুবে বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটে এশিয়াতেই। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াতে।
‘সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবির) পরিচালক ড. আমিনুর রহমান বলেন, পানিতে ডুবে রেকর্ড সংখ্যক শিশু মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে—চার দিকে বিভিন্ন ধরনের জলাশয়, পুকুর, নদী, ডোবা, খাল, বিলে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টাতে ভরা পানি থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক পুকুর। শতকরা ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা পুকুরেই ঘটে। যা বাড়ির সীমানার ২০ মিটারের মধ্যে। এ ছাড়া শিশুকে দেখা শোনার অভাবে, শতকরা ৬০ শতাংশ শিশু সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে এই পানিতে ডুবে মরার ঘটনা ঘটে। কারণ এ সময়টাতে মায়েরা কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর বাবারা থাকেন কর্মস্থলে, আর শিশুর বড়ো ভাই-বোন থাকলে তারা থাকে স্কুলে। ফলে এই সময়টাতে শিশু থাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী ভারতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু বাংলাদেশেই বেশি হয়। দেশে প্রতি লাখে এক থেকে চার বছর বয়সি ৭১ থেকে ৭২ শিশুর মৃত্যু হয়।
দেখা গেছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরাই এই পানিতে ডুবে মৃত্যুর শিকার হয় বেশি। আর বড়ো শিশু যারা মারা যায়, তাদের ক্ষেত্রে সাঁতার না জানা অন্যতম কারণ। এছাড়া তাত্ক্ষণিক প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়ার জ্ঞান না থাকা। মূলত ১০ বছর বয়সের নিচের শিশুরাই পানিতে ডুবে মৃত্যুর শিকার হচ্ছে বেশি।
সিআইপিআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়, পানিতে ডুবে শিশুরা মারা গেলেও বিষয়টি নিয়ে একেবারেই কোনো কথা শোনা যায় না। পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রতিরোধে ‘সিআইপিআরবি’ বেশ কিছু কাজ হচ্ছে বলেও জানায় তারা। তারা আরো জানায়, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে তারা আঁচল, ভাসা (ফ্লোটিং), সিসেফ নামের বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
পানিতে ডোবা শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ভাসা’ প্রজেক্টের টিম লিডার ডা. হোমায়রা মাশতুর বলেন, এত মৃত্যুর পরও নানা কারণে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় না। সেটা হতে পারে জনশক্তির অভাব বা প্রতিরোধমূলক আইনের অভাবে। একইসঙ্গে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত জাতীয়ভাবে ‘ড্রাউনিং প্রিভেনশন স্ট্রাটেজি’ নাই।