সাফল্য যাহারা আনে, তাহারা কতকাল বঞ্চিত থাকিবে?

বাংলাদেশ নারী জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসে আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজিত হইল। ফিফা হালনাগাদ র‍্যাংকিং অনুযায়ী ২৪ ধাপ উন্নীত হইয়া এই দল স্থান পাইয়াছে ১০৪ নম্বরে-যাহা চলতি সময়ে বিশ্বের সবচাইতে বড় ব্ল‍্যাংকিং অগ্রগতির দৃষ্টান্ত। এই উত্থান কেবল একটি পরিসংখ্যান নহে, ইহা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার, নীরবে নিজেদের সর্বোচ্চটি প্রদান করিবার এক অপূর্ব অগ্রযাত্রার প্রতিচ্ছবি।

বলিবার অপেক্ষা রাখে না. এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নহে। মিয়ানমারে এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ৭৩ ধাপ আগাইয়া থাকা স্বাগতিকদের পরাস্ত করিয়া এবং বাহরাইনকেও হারাইয়া যে সাফল্য অর্জন করিল বাংলাদেশ নারী দল, তাহার যথোচিত প্রতিদানই এই র‍্যাংকিং উন্নয়ন। যাহারা মাঠে ঘাম ঝরাইয়া দেশকে গর্বিত করিয়াছেন, তাহারা আজ প্রমাণ করিয়াছেন-সুযোগ পাইলে নারীরাও পারেন এবং হয়তো আরো বেশি করিয়া পারেন।

এই গৌরবের ভাগীদার আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ বা ক্রীড়া-প্রশাসন; কিন্তু সেই ভাগ লইবার পূর্বে তাহারা কি ভাবিয়া দেখিবেন, কতখানি প্রতিকূলতার ভিতর দিয়া এই অর্জন আসিয়াছে বাংলাদেশ নারী দলের? বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বাস্তবতা বলিয়া দেয়, এই সাফল্যের পথ কণ্টকময়; এইখানে প্রতিটি অর্জনের নেপথ্যে রহিয়াছে সহস্র বাধা, উপেক্ষা ও বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া। একই পতাকার নিচে খেলেন বাংলাদেশের পুরুষ ও নারী দল; কিন্তু সুবিধা, পারিশ্রমিক, সুযোগ-সুবিধা, এমনকি আবাসনের দিক দিয়াও দুই দলের মধ্যে যে প্রভেদ বিদ্যমান, তাহা কেবল লজ্জার নহে-ইহা জাতীয় পরিকল্পনার ব্যর্থতাও। পুরুষদের জন্য রহিয়াছে বৎসরব্যাপী নির্দিষ্ট সূচি, পেশাদার লিগের কাঠামো, বহু স্তরে বিভক্ত প্রতিযোগিতা ও মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক। অপরদিকে, নারীদের জন্য নাই নিয়মিত লিগ, নাই আর্থিক নিশ্চয়তা, নাই সামাজিক নিরাপত্তাও। একাধিক বার এমন ঘটনাও ঘটিয়াছে-জাতীয় দলের নারী ফুটবলাররা ক্লাব না পাইয়া খেলিবার সুযোগের জন্য ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের করুণা প্রত্যাশা করিয়াছেন।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যেইখানে পুরুষ দল এক দশকের অধিককাল সাফ ট্রফির বাহিরে, সেইখানে নারীরা ২০২২ ও ২০২৪-উভয় আসরেই চ্যাম্পিয়ন হইয়াছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে ট্রফি ধরিয়া রাখিবার একমাত্র উদাহরণ নারীদের মাধ্যমেই আসিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও, স্পনসর আসে না, লিগ হয় অনিয়মিত, পারিশ্রমিক থাকে 'পেটেভাতের' পর্যায়ে। ইহা কি কেবল ক্রীড়াক্ষেত্রের অবিচার? না, ইহা নহে। ইহা এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গভিত্তিক অসাম্যের প্রতিচ্ছবি। এই বৈষম্য ঘুচাইবার দায় প্রথমত রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের উচিত একটি পূর্ণাঙ্গ নারী ফুটবল কৌশল প্রণয়ন করা-যাহাতে থাকিবে সুনির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জি, বয়সভিত্তিক স্তর বিভাজন, ঘরোয়া টুর্নামেন্ট ও পেশাদার ক্লাব কাঠামো। নারী কোচ, সংগঠক ও প্রশাসকের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিয়া কেবল দল গঠন নহে-ফুটবল সংস্কৃতি গঠনের দিকেও যাত্রা শুরু করা আবশ্যক। অন্যদিকে, করপোরেট সংস্থাগুলিরও উচিত পুরুষ ফুটবলের বাহিরে তাহাদের পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা। সমাজে তাহারা কিছু ইতিবাচক ভূমিকা রাখিতে চাহে, তাহাও পালিত হইবে এই ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। নারী খেলোয়াড়দের বেতন, চিকিৎসা, আবাসন ও নিরাপত্তা-এই সকল মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা প্রদান করিতে হইবে, যদি আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নারী ক্রীড়ার প্রতি উৎসাহিত করিতে চাই।

নারীরা যদি বৈষম্যের মধ্যেও দেশের জন্য এমন সম্মান আনিতে পারেন, তাহা হইলে তাহাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা কোনো দয়া নহে, ইহা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখিতে হইলে, তাহা একমাত্র নারী ফুটবল দলকে ঘিরিয়াই সম্ভব। কারণ, সাফল্য যেইখানে আছে, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা সেইখানে হওয়া উচিত। আজ যাহারা শতধা বাধা ছিঁড়িয়া সামনের দিকে ধাবমান, তাহাদের পিছনে দাঁড়াইবার সময় এখনই। কারণ এই দেশ-তাহার লাল-সবুজ পতাকা-তাহার গৌরব-তাহা নারী-পুরুষ উভয়ের সমান।