শিক্ষকের বিদায়বেলা ও সুকর্মের শক্তি

মানুষের জীবনের নানা পর্যায়ে 'বিদায়'-এর মুহূর্ত আসে। তাহা কখনো কর্মজীবন হইতে কখনো পুরা জীবন হইতেই। সময়ের অদম্য প্রবাহ সকলকেই একদিন তাহার প্রিয় আসন, প্রিয় কর্মক্ষেত্র ও প্রিয় মানুষের নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। কিন্তু সকল বিদায়ের রূপ এক নহে। কাহারো বিদায় আসে নীরব বিস্মৃতির আঁধারে, আবার কাহারো বিদায় রূপান্তরিত হয় অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মহোৎসবে। কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মজিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার সূত্রধরের বিদায়বেলা সেই দ্বিতীয় ধরনের অন্তর্গত-যেইখানে সুকর্মের দীপ্তি বিদায়মুহূর্তকেও পরিণত করিয়াছে স্মরণীয় মর্যাদায়। ১৯৮৯ সালে বিদ্যালয়ের দ্বারপ্রান্তে প্রবেশ করিয়াছিলেন এক তরুণ শিক্ষকরূপে; ৩৬ বৎসরের নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাজীবন শেষে গত বৃহস্পতিবার স্বপন কুমার সেই দ্বার পার হইলেন এক পূর্ণতার আলোকোজ্জ্বল শিক্ষাব্রতীরূপে। শেষ কর্মদিবসে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাহার হাতে ক্রেস্ট ও উপহার তুলে দিলেন, গলায় পরাইলেন ফুলের মালা, এবং প্রিয় শিক্ষককে দুই কিলোমিটার হাঁটিয়া নিজ গৃহে পৌঁছাইয়া দিলেন। এই দৃশ্য কেবল আনুষ্ঠানিক বিদায় নহে; ইহা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অন্তরের গভীরতম বন্ধনের এক জীবন্ত প্রতীক। আমরা কিছুদিন পূর্বেই দেখিয়াছি, কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তাহাদের শিক্ষককে অপমান করিয়াছে, জোর করিয়া অপসারণ করিয়াছে। শিক্ষকের দোষ ছিল কি না-ইহা বিচারের বিষয়, কিন্তু স্বপন কুমারের বিদায়বেলার দৃশ্য পুনরায় প্রমাণ করে যে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক প্রধানত নীতির ও আদর্শের।

আমরা ভুলিয়া যাই, মানুষের জীবনসীমা ক্ষণিক, কিন্তু সুকর্মের স্থায়িত্ব সীমাহীন। প্রাচীন ভারতীয় উপকথায় বলা হয়, বীজ যদি উত্তম হয়, তবে মৃত্তিকার গর্ভে সে একদিন বৃক্ষে পরিণত হইবে; আর মন্দ বীজ যতই যত্নে বপন করো, তাহা কখনো ভালো ফল দিতে পারিবে না। সুকর্ম সেই উত্তম বীজ-যাহার ফল কখনো বিলীন হয় না, বরং প্রজন্মান্তরে ফলপ্রসূ হয়। দৃষ্টান্ত আরো অনেক রহিয়াছে। প্রাচীন গ্রিক উপকথায় এক রাজাকে জিজ্ঞাসা করা হইল-'তোমার রাজ্য কতদিন টিকিবে?' রাজা বলিলেন, 'যতদিন আমার প্রজারা আমার সুকর্মের কথা স্মরণ করিবে, ততদিনই আমার রাজ্য অমলিন থাকিবে।' এই উপকথা আমাদের শিখায়-ক্ষমতার স্থায়িত্ব নহে, সুকর্মের স্মৃতি-সংরক্ষণই মানুষের প্রকৃত রাজ্য। সময়ের অব্যর্থ ন্যায় একদিন সকলকেই বিচারের সম্মুখে দাঁড় করায়; সেইখানে সুকর্মই হয় মানুষের একমাত্র সুপারিশকারী। এই প্রসঙ্গে, সুফি সাধক জালালউদ্দিন রুমির অমর গ্রন্থ 'মসনবি-ই-মানভি' হইতে একটি উপকথা স্মরণ করা যাইতে পারে। এক ব্যক্তি মৃত্যুর পরে মহান স্রষ্টার দরবারে উপস্থিত হইল। স্রষ্টা বলিলেন, 'তুমি কী আনিয়াছ?' সেই ব্যক্তি উত্তর দিল, 'আমার কিছুই নাই-শুধু কিছু মানুষ আছে, যাহারা আমার কারণে একদিন সুখ-আনন্দ পাইয়াছিল।' স্রষ্টা তখন হাসিলেন ও বলিলেন, 'মানুষের অন্তরে তুমি যে আনন্দ দিয়াছিলে, তাহা আমারই দয়া; আর যেহেতু তাহা আমারই, সেহেতু তাহা সর্বোত্তম দান।'

এই উপকথা আমাদের শেখায়-মানুষকে আনন্দ, শান্তি ও কল্যাণ দান করাই মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ কর্ম। স্বপন কুমারের বিদায়বেলায় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের চোখের জল, হাসি ও সম্মানই এই সত্যের মূর্ত প্রমাণ। আমাদের স্মরণ রাখা উচিত-মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার হইল তাহার রাখিয়া যাওয়া কর্ম। সুকর্মের বীজ একদিন ফুল ও ফলের রূপ লইবে, আর দুষ্কর্মের বীজও তদ্রূপই ফলপ্রসূ হইবে-তবে তাহা হইবে তিক্ত। অতএব, যে কেহ অমরত্ব কামনা করে, সে যেন সুকর্মের মাধ্যমে জীবন পূর্ণ করিয়া যায়, কেননা একমাত্র সুকর্মই মৃত্যুর পরেও কথা কয়। বস্তুত, কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি দুষ্কর্ম করিতে পারে না। কারণ, দুষ্কর্ম করা আর নিজের মুখে কালিমা লেপন করা সমান কথা। মানুষ হইল সৃষ্টির সেরা জীব। সুতরাং তাহাদের অ-বুদ্ধিমান হওয়া সাজে না। আমরা সকলে যদি বুদ্ধিমান হই এবং সুকর্ম করি, তাহা হইলে এই পৃথিবীর বেশির ভাগ সমস্যাই দূর হইয়া যাইবে।