ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে রাজধানীর ডেমরার পাইটি এলাকার মৃত মো. লিয়াকত আলীর বাড়িসহ ৫ কাঠার জমির উপর নির্মিত বাড়ি বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয় রবিউল মল্লিককে ছেলে ওয়ারিশ সাজিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার বাড়ি দখল করেছে চক্রটি। সেই চক্রের মূল হোতা মাতুয়াইলের অভিযুক্ত রাকিব আলী। এর ফলে চরম বিপাকে পরেছেন সম্পত্তিটির তিন বৈধ উত্তধিকার ওয়ারিশ।
জানা যায়, ডেমরার পাইটি এলাকার বাড়িসহ ৫ কাঠার জমির মালিক মো. লিয়াকত আলী। তিনি মারা যাওয়ার তার ওয়ারিশ হন দুই মেয়ে ১-মাহজাবিন আক্তার লিংকা, ২-জাহিনা আক্তার লিয়া (প্রতিবন্ধী) এবং তার ২য় স্ত্রী ফাতেমা বেগম (নিঃসন্তান)। এছাড়া কোনো ওয়ারিশ নেই। বাবা লিয়াকত আলী মারা যাওয়ার পর পুরো সম্পত্তি দেখভাল করে আসছেন বড় মেয়ে মাহজাবিন আক্তার লিংকা। প্রতিবন্ধী ছোট বোনের উন্নত চিকিৎসার জন্য জমিটি বিক্রি করার লক্ষ্যে মাতুয়াইলের রাকিব আলীকে জমির দলিলপত্রসহ সকল কাগজপত্র দেওয়া হয়। সেই রাকিব আলী অসহায় এতিম তিন নারীর সরলতার সুযোগে নিয়ে স্থানীয় ‘রবিউল মল্লিক’ নামে একজনকে জমির মালিক মো. লিয়াকত আলীর ১ম স্ত্রীর একমাত্র ছেলে সন্তান দাবি করে নকল কাগজপত্র দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে ওয়ারিশ হয়ে জমিটি মো. রাকিব আলী ও তার বোন রিপা আক্তার ও ব্যবসায়ী অংশীদার মো. আরিফুল ইসলামের নিকট বিক্রি করে দেন। যার দলিল নাম্বার ১০৬২৬/২০২৪ (ডেমরা রেজিষ্ট্রার অফিস)।
স্থানীয় প্রতিবেশী মাসুদ সর্দার (লিয়াকত আলীর সাবেক সহকর্মী), মো রফিক ও সুলতানা বেগম ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, 'লিয়াকত আলী ও তার পরিবার গত ১৯ বছর ধরে এখানে আমাদের সঙ্গে বসবাস করে আসছে। তার দুই মেয়ে ও দ্বিতীয় স্ত্রী ছাড়া আর কোনো ওয়ারিশ নেই। এখন শুনি লিংকা যাকে তাদের বাড়ি বিক্রি করতে দিয়েছেন, সে নিজেই ভুয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে বাড়ির মালিক হয়ে গেছেন। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে এর সঠিক বিচার চাই।'
জানা যায়, ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে এনআইডি বানিয়ে ভুয়া ওয়ারিশে সাজানো চক্রের মূল হোতা যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের জমির দালাল অভিযুক্ত মো. হাশেম আলীর ছেলে রাকিব আলী (৩৬)।
মৃত মো. লিয়াকত আলীর একমাত্র ছেলে দাবি করা স্থানীয় রবিউল মল্লিক ডেমরার কোনাপাড়া ধার্মিকপাড়ার প্রখ্যাত হিন্দুদের মল্লিকবাড়ির বংশধর। তিনি একজন সনতান ধর্মালম্বী অনেকই জানে । ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে জমির দালালী তার পেশা। স্থানীয়রা তাকে বিভিন্ন নামেই ডাকে।
এই চক্রের ৩য় এবং ৪র্থ জন হলেন জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী শাহনেওয়াজ পারভীন। তারাও জমির দালাল হিসেবে পরিচিত।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মাহজাবিন আক্তার লিংকা ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, ‘এই প্রতারণা ও অন্যায়ের বিচার আমরা চাই। বর্তমানে আমি আমার প্রতিবন্ধী ছোট বোনের উন্নত চিকিৎসা করতে পারছি না। এই বাড়ি ছাড়া আমাদের আয়ের কোনো পথ নেই। এই প্রতারণার মাস্টারমাইন্ড হলো রাকিব আলী আর টাকার বিনিময়ে ঝালকাঠির নলসিটির উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এইচ এম গোলাম মোস্তফা এনআইডি কার্ড তৈরি করে দেন। '
তিনি আরও বলেন, 'রাকিবকে ভালো লোক মনে করে আমাদের বাড়িটি বিক্রি করতে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই বাড়ির মালিক! তার সঙ্গে আমার কথকোপনের সব কিছু রেকর্ড আছে। আর আমার ভাই দাবি করা রবিউল মল্লিক - তাকে আমারা কেউ চিনি না। এতদিন তিনি কোথায় ছিলেন, তাকে তো বাবার জীবদ্দশায় তাকে কোনোদিন দেখি নাই। সে রাকিবের লোক। রবিক একদিন তাকেসহ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।’
লিংকা বলেন, ‘আমার মা ২০১৪ মারা যায়। এরপর ছেলে সন্তানের আশায় ২০১৪ সালে আমার বাবা লিয়াকত আলী ২য় বিয়ে করেন ফাতেমা বেগমকে। এরপর ২০২১ সালের এপ্রিলে আমার বাবা (লিয়াকত) মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ৩ জন ওয়ারিশ রেখে যান। আমার সৎ মা ফাতেমা বেগম (নিঃসন্তান) ও আমার দুই বোন মাহজাবিন আক্তার লিংকা এবং জাহিনা আক্তার লিয়া (প্রতিবন্ধী)। এছাড়া কোনো ওয়ারিশ নেই। আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। ওয়ারিশ সনদপত্র ছাড়াও অনেক কাগজপত্র রয়েছে। প্রয়োজনে আমাদের রবিউলেরে সঙ্গে আমারা দুই বোনেরে ডিএনএ টেস্ট করুক। আমি আইনি ব্যবস্থ্যা গ্রহণ করছি। আদালত সব প্রমাণ করবে। বিষয়টি এখন পুলিশের সিআইডিতে তদন্তাধীন।’
নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোটারের ৪০ উর্দ্ধে বয়স হলে অবশ্যই তাকে অনলাইন জন্মসনদ, নাগরিক প্রত্যয়ন পত্র। বাবা-মায়ে ভেরিফাই কাবিননামা। বাবা-মা ২০০৮ সালের আগে মারা গেলে অনলাইন ওয়ারিশ সনদ পত্র। মেজিসট্রেট আদালত হতে প্রত্যয়ন পত্র। শিক্ষাগত সনদ বা প্রত্যয়ন পত্র। রক্তের গ্রুপ ও নিজ বা ভাড়ার বাড়ির মিউটিশন ও সর্বশেষ খাজনাপত্র।
ইত্তেফাক ডিজিটালের অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিউল মল্লিকের ভোটার ফর্মে উল্লেখ আছে, অভিযুক্ত রবিউল মল্লিক বরিশাল বিভাগ হতে থেকে ২০২৩ সালে তার এনআইডি কার্ডটি (এনআইডি নাম্বার ২৪২৫৮৬৯৫১৪) তৈরি করেন। জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭২, বর্তমান বয়স বয়স ৫৩ বছর। তার ভোটার কার্ডে দেওয়া মায়ের নাম (মৃত) ছালেকা বিবি মল্লিক। তার বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম ও ডাকঘর মাদারঘোনা, থানা নলসিটি এবং জেলার নাম ঝালকাঠি। তবে জন্মস্থান দেওয়া ঢাকার দখলকৃত বাড়ির ঠিকানা।
ভূয়া জাতীয়পত্র পিতা দাবি করা লিয়াকত আলীর আসল এনআইডি নং ৪৬০৭৭৩*** কিন্তু ভোটার ফরমে দেওয়া লিয়াকত আলীর এনআইডি নং ৪৬০৭৭৩**** অর্থ্যাৎ শেষ চার সংখ্যায় মিল নেই। রবিউল মল্লিকের ভোটার ফরমে উল্লেখ করা লিয়াকত আলীর মৃতসালের সঙ্গেও আছে গড়মিল।
এ ছাড়া ভোটার ফরমে কোনো কাজগপত্র পাওয়া যায়নি। অর্থ্যাৎ তার ডাটা এট্রি প্রুফ কপি সম্পূর্ন ফাঁকা। এনআইডি তৈরি করতে তিনি শুধু জন্ম নিবনন্ধন (১৯৭২৬৭৯৪৪২০২৪২৮৬৯) জমা দেন। জন্ম নিমন্ধনটি নারায়নগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০ নং ওয়ার্ড হতে ২৬ মার্চ ২০২৩ সালে তৈরি।
তার বাবা দাবি করা মৃত মো. লিয়াকত আলীর জন্ম সাল ১৩ জুন ১৯৫৬। অর্থাৎ বাবা ছেলের বয়সের ব্যবধান ১৬ বছর। অর্থাৎ সে অনুযায়ী, তিনি ১৫ বছরে বয়সে বাবা হয়েছেন!
নতুন ভোটার নিবন্ধন করতে যে ফোন নাম্বারটি সার্ভারে দেওয়া সেই নাম্বারটি হলো অভিযুক্ত মো. রাকিব আলীর ব্যবহৃত ফোন নাম্বার (০১৭২৫-৮৭০##)।
এ ছাড়াও ভোটার ফর্মের ২ নং পাতায় যাচায়কারীর নাম ও স্বাক্ষর নেওয়া নলছিটির থানার ৫ নং সুবিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নং ওয়ার্ড এর ইউপি সদস্য/মেম্বার মো. আ. লতিফ খানের স্বাক্ষর ও সরকারি সিলটি নকল হয়। এমনকি মেম্বার মো. আ. লতিফ খানের স্বাক্ষরের সঙ্গে কোনো মিল নেই।
এ প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য মো. আ. লতিফ খান ইত্তেফাক ডিজিটালকে জানান, ‘বরিউল মল্লিক নামে কেউকে চিনেন না। এই ঠিকানায় কোনো বাড়িও পাওয়া যায়নি। প্রতারকরা আমার স্বাক্ষর ও সরকারি সিলটি নকল করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে। কিন্তু ভোটার ফর্মের সঙে আমার স্বাক্ষরের মিলও নেই। পুরোটাই প্রতারণা।’
অভিযুক্ত রবিউল মল্লিকের ভোটার নিবন্ধন ফর্মটি ভেরিফাই করেন ঝালকাঠির নলসিটির উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এইচ এম গোলাম মোস্তফা। ল্যাপটপ আইডি নাম্বার ইসিএস/৪২৭৩/০০০৫। তিনি এই এনআইডি তৈরিবাবদ ১০ লাখ টাকা গ্রহণ করেছে নলছিটি নির্বাচন অফিসের একটি সূত্রে জানা গেছে।
নলসিটির উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এইচ এম গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ দিকে ভুয়া এনআইডি দিয়ে ভুয়া ওয়ারিস হওয়া রবিউল মল্লিকের বর্তমানে কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ডেমরা এসিল্যান্ড অফিসে সূত্রে জানা যায়, গত ৮/০৯/২০২৪ সালে রবিউল মল্লিক একটি নামজারি করান। আবেদন নাম্বার ১০১৮১৭০৭, মিউটেশন মামলা নাম্বার ২৫৪৬/২৪/২৫। মিউটেশনে আবেদনকারীর মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে দালাল জাকির হোসেনর স্ত্রী শাহনেওয়াজ পারভীনের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার। মিউটেশনে জমির মালিক উল্লেক করা হয় ১. রবিউল মল্লিক, ২. মাহজাবিন আক্তার লিংকা, ৩. ফাতেমা বেগম। মিউটেশনে মাহজাবিন আক্তার লিংকা আরেক জীবিত বোন উত্তরাধিকার জাহিন আক্তার লিয়ার নাম নেই।
এছাড়া মিউটেশনে ওয়ারিশ সদনদপত্র হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭০ নাম্বার ওর্য়াডের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিকের কাউন্সিলর পেডে দুইটি নকল ও ফটোশপে এডিটিং ওয়ারিশ সনদপত্র জমা দেয়। যার একটির স্বারক নং-ঢা.দ.সি.ক. ও ৭০.২০২১.০৪(২১)। উক্ত সনদপত্রে ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক উল্লেক করা হয় ১. রবিউল মল্লিক, ২. মাহজাবিন আক্তার লিংকা, ৩. ফাতেমা বেগম।
৭০ নাম্বার ওর্য়াড কাউন্সিলর অফিসে যোগাযোগ করা হলে ওয়ারিশ সনদপত্রটি নকল ও ফটোশপে এডিটিং বলে জানান। মূলত প্রকৃত ওয়ারিশ সনদপত্রটি স্বারক নং-ঢা.দ.সি.ক. ও ৭০.২০২১.০৪(২১) ঠিক থাকলেও রবিউল মল্লিকের ওয়ারিশ সনদপত্রটি(সাদাকাগজ) তিনি এডিট করে সেখানে উল্লেখ করেন ১. রবিউল মল্লিক, ২. মাহজাবিন আক্তার লিংকা, ৩. ফাতেমা বেগম। অথচ আসল ওয়ারিশ সনদপত্রটিতে প্রকৃত ওয়ারিশ হলেন; ১. ফাতেমা বেগম, ২. মাহজাবিন আক্তার লিংকা,৩. জাহিন আক্তার লিয়ার নাম উল্লেখ রয়েছে। সনদপত্রের তারিখ উল্লেখ আছে ২১/০৪/২০২১ সালে।
ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সাজানোর অভিযুক্ত মাস্টামাইন্ড রাকিব আলী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। লিংকা নিজেই জমি আত্নসাৎ করতে চেয়েছিল। আমি তার ভাইকে খুঁজে বের করে তার কাছ থেকে জমি ক্রয় করি। এর বাহিরে আমি কিছু জানি না।’
অভিযুক্ত বরিউল মল্লিক ৫২ বছর বয়সে কীভাবে এনআইডি তৈরি করলেন- এ বিষেয়ে ঢাকা জেলার সিনিয়র নির্বাচন অফিসের অতিরিক্ত নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ মমিন মিয়া ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, ‘মো. লিয়াকত আলী ১০-৪-২০২১ সালে মারা যায়, আর ছেলে দাবি করা রবিউল মল্লিকের এনআইডি কার্ডটি ২০২৩ সালে তৈরি। তার মানে এখানে নিশ্চিত গোলমাল রয়েছে। ৫৩ বছর হলো - এতদিন এনআইডি কার্ড তৈরি করেনি, এটাও একটা রহস্য। অভিযুক্ত রবিউলের এনআইডি কার্ডটি (২৪২৫৮৬৯৫১৪) তদন্ত করলে সব বেরিয়ে আসবে। নলছিটির নির্বাচন কর্মকর্তার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের নির্বাচন অফিসে লিখিত আবেদন করতে বলেন।’
উল্লেখ্য, ভুল তথ্য প্রদান কিংবা জাল, তথ্য-উপাত্ত বিকৃত ও একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র বহন করলে জেল-জরিমানাসহ ১ সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও দশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা আর্থিক জরিমানা হতে পারে।
এছাড়া ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বলা আছে, অন্যের জমি নিজের দখলে রাখা, ভুয়া বা মিথ্যা দলিল তৈরি এবং নিজ মালিকানার বাইরে অন্য কোনো জমির অংশবিশেষ উল্লেখ করে দলিল হস্তান্তরে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।