প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের উপকূলের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, বিশেষ করে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, দ্রুত বেড়ে ওঠা প্লাস্টিক দূষণের মারাত্মক হুমকির মুখে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রথমবারের মতো সৈকতের ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, পর্যটন, নদীপথে বয়ে আসা প্লাস্টিক ও একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারই এর মূল উৎস।

বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপট স্থল ও সামুদ্রিক পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্রমবর্ধমান সঞ্চয়ের কারণে প্লাস্টিক দূষণ আজ একটি বৈশ্বিক পরিবেশগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়। বড় প্লাস্টিক বর্জ্য ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছোট কণায় (মাইক্রোপ্লাস্টিক বা MP) বিভক্ত হয়, যা বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের কারণে বিশ্বের দূরবর্তী এলাকাতেও পৌঁছে যায়।

অনুমান করা হয়, বিশ্বে ইতিমধ্যেই ৬.৩ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সতর্ক করেছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি হবে। আকারে ছোট ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় MPs বেশি ক্ষতিকর এবং দূর করা কঠিন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, বিশেষত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, প্লাস্টিক দূষণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

কুয়াকাটা সৈকতে প্রথমবারের মতো MPs এর উল্লম্ব বিস্তার শনাক্ত সম্প্রতি কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রথমবারের মতো গবেষণায় দেখা গেছে যে সৈকতের পলিতে ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত MPs রয়েছে। গবেষণাটি করেছেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাসাগরবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক রিমু দাস, যা রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি ফেলোশিপ, বাংলাদেশ দ্বারা অর্থায়িত। প্রধান উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য, নদীপথে ভেসে আসা প্লাস্টিক এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার।

আটটি স্থানে পলি সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেখানে পর্যটকপ্রবণ ও পর্যটকবিহীন এলাকা তুলনা করা হয়। নমুনা তিনটি স্তর থেকে নেওয়া হয়—স্তর ১ (০–১০ সেমি), স্তর ২ (১০–২০ সেমি), এবং স্তর ৩ (২০–৩০ সেমি)। গড় MPs ঘনত্ব ছিল যথাক্রমে ২৩২ ± ৫২, ২৩৬.২৫ ± ৫৪.৪২, এবং ২৩৮.৭৫ ± ২৮.৮৫ কণা/কেজি। সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে S4 স্থানে (৪৬৬.৬৭ ± ৩৭.১২ কণা/কেজি) এবং সর্বনিম্ন S7 (১২৩.৩৩ ± ১২.০২) ও S8 (১১০ ± ১৭.৩২) স্থানে।

সব স্তরেই অনিয়মিত আকারের ফ্র্যাগমেন্ট MPs আধিপত্য বিস্তার করেছে, যার মধ্যে S4 স্থানের স্তর ২-এ সর্বোচ্চ ৫৬% ছিল। অন্যান্য ধরণের মধ্যে ফাইবার, মাইক্রোবিড ও ফিল্ম পাওয়া গেছে। রঙিন MPs (৮৭%) সাদা বা স্বচ্ছের তুলনায় বেশি ছিল, এবং ধূসর রঙ সবচেয়ে বেশি। MPs-এর আকার ৫০–২০০০ মাইক্রোমিটার, তবে ২০০০ মাইক্রোমিটারের বেশি বড় MPs গভীর স্তরে বেশি ছিল। সেলোফেন (৫০%) ছিল প্রধান পলিমার, এরপর নাইলন ৬.৬ (২৫%), পলিথিন (২০%), এবং পলিপ্রোপিলিন (৫%)।

দূষণ সূচক বিশ্লেষণ সব সাইটই Pollution Load Index (PLI) এর ক্যাটাগরি ১-এর মধ্যে ছিল, যা কম মাত্রার দূষণ নির্দেশ করে। তবে Pollution Hazard Index (PHI)-এ স্তর ১ ক্যাটাগরি IV-এ পড়েছে, যা অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি বোঝায়।

উল্লম্ব বিস্তারে প্রভাবকারী কারণসমূহ কুয়াকাটার S4 স্থানটি জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পর্যটকদের প্রধান কেন্দ্র, S7 একটি ম্যানগ্রোভ এলাকা, আর S8 তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয় সূর্যোদয় পয়েন্ট। S4 স্থানে সর্বোচ্চ MPs ঘনত্বের কারণ পর্যটন-সম্পর্কিত বর্জ্য, এবং এটি বাতাসের প্রভাবে সমুদ্র সঞ্চালন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। বেন্থিক জীবের কার্যকলাপও MPs কে উল্লম্বভাবে স্থানান্তরে সাহায্য করতে পারে।

পর্যটকদের পোশাক, মাছ ধরার সুতা, দড়ি, যন্ত্রপাতির ফিল্টার ও অন্যান্য পর্যটন-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড ফ্র্যাগমেন্ট ও ফাইবার বৃদ্ধির জন্য দায়ী। ধূসর MPs-এর আধিক্য প্যাকেজিং ও মাছ ধরার কাজে ধূসর প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত। সেলোফেন মূলত খাবারের প্যাকেজিং ও শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, যা কুয়াকাটায় উচ্চ মাত্রায় পাওয়া গেছে।

মাইক্রোবিয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য টেকসই সমাধান MPs মাইক্রোবিয়াল সংযুক্তির জন্য উপযুক্ত পৃষ্ঠ সরবরাহ করে, যেখানে ব্যাকটেরিয়া বায়োফিল্ম তৈরি করে এবং প্লাস্টিক ভাঙার এনজাইম নিঃসরণ করে। ইতোমধ্যেই Pseudomonas, Bacillus, Rhizopus এবং Ideonella sakaiensis এর মতো ব্যাকটেরিয়া পলিথিন ও পলিস্টাইরিন ভাঙতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। এসব ব্যাকটেরিয়া পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কুয়াকাটায় প্রতিদিন প্রায় ৩২৩ কেজি অবিনষ্টযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। “কুয়াকাটা উপকূলের MPs-এর আনুভূমিক ও উল্লম্ব বিস্তার” নিয়ে করা এই গবেষণা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক উপকূল ব্যবস্থাপনায়ও টেকসই মডেল হতে পারে। দ্রুত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই যুগে বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি।

লেখক: প্রভাষক, 
ওশানোগ্রাফি বিভাগ
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা, বাংলাদেশ