সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধের খোঁজে বুলবুল

রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে গতকাল দীর্ঘ আলোচনায় বসেছিলেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তারা। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ক্রিকেটারদের বাস্তব সমস্যাগুলো শোনা, তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া এবং বোর্ডের করণীয় নির্ধারণ করা।

দীর্ঘ আলোচনা সভা শেষে বুলবুল জানিয়েছেন, 'শেয়ার অ্যান্ড কেয়ার নামের এই প্রোগ্রামে মাঠের ক্রিকেটার, ডাগআউটের স্টাফ এবং বোর্ডে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের তিনটি আলাদা দলকে একসঙ্গে বসানো হয়েছে। প্রতিটি পক্ষের পারফরম্যান্স, ঘাটতি ও উন্নতির দিক নিয়ে জরিপ করা হয়েছে, খেলোয়াড়দের কাছ থেকে লিখিত মতামত নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করে আলোচনা হয়েছে। ক্রিকেটাররা তাদের সুবিধা-অসুবিধা খোলামেলা জানাতে পেরেছেন এবং আলোচ্যসূচির বাইরেও মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে নিজেদের কথা বলেছেন।'

বুলবুলের ভাষায়, খেলোয়াড়েরা শুধু মাঠে নন, বোর্ডের চোখে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার। মাঠের খেলার পাশাপাশি লজিস্টিক, অনুশীলন সুবিধা, চিকিৎসা ও পিচ কন্ডিশনের মতো নানা বিষয়ে তারা কতটা সহায়তা পাচ্ছেন, সে ব্যাপারেও সরাসরি কথা বলেছেন। সভাপতি আশাবাদী, এ ধরনের আলোচনার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে ক্রিকেটারদের প্রকৃত চাহিদা কোথায় এবং কীভাবে বোর্ড সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। প্রতি তিন মাস পরপর এরকম সেশন আয়োজনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আলোচনায় এসেছে ম্যাচ ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের মতো গুরুতর বিষয়ও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করা অ্যালেক্স মার্শাল উপস্থিত থেকে বোর্ডকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কীভাবে খেলার সততা রক্ষা করা যায়, কীভাবে এন্টি-ডোপিং প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা যায়, সে বিষয়ে তার পরামর্শ নিয়েছে বিসিবি। সভাপতি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে গঠিত তদন্ত কমিটির ফিক্সিং সম্পর্কিত প্রতিবেদন আসার পর বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

শুধু জাতীয় দল নয়, আলোচনায় ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়েও মতামত দিয়েছেন সিনিয়র খেলোয়াড়রা। বিশেষ করে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) বিকেএসপিতে খেলতে গিয়ে যে সমস্যা হয়, তা তুলে ধরা হয়েছে। নারী ক্রিকেট নিয়েও আলাপ হয়েছে। আসন্ন বিশ্বকাপ সামনে রেখে নারী দল বিকেএসপিতে প্রস্তুতি নিলেও সেটি যথাযথ নয় বলে মনে করেন সভাপতি। তিনি জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই নারী ক্রিকেটারদের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক হবে। 

সবশেষে গণমাধ্যমকে নিয়েও কথা বলেছেন বিসিবি সভাপতি। তার মতে, খেলাটিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে মিডিয়ার ইতিবাচক সমালোচনা অপরিহার্য। বুলবুল বলেছেন, 'যে সেশনটা হলো শেয়ার অ্যান্ড কেয়ার, এখানে খেলোয়াড়রা এবং কর্মকর্তারা বসেছিলাম। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সাংবাদিকরাও খেলার একটা অংশ, আমাদের দলের একটা অংশ। আমাদের ইতিবাচক সমালোচনা করবেন যেন আমরা ক্রিকেটটা ভালোভাবে চালাতে পারি। আমরা ক্রিকেট বোর্ড একটা সংগঠন, আপনারাও ক্রিকেটের অংশ। আমরা আশা করি, আপনাদের সহায়তা সবসময় পাবো। আরও আশা করছি, আইসিসির কোনো একটা বিশ্বকাপে আমরা ভালো করবো এবং গণমাধ্যমকর্মীরা সেটার একটা অংশ থাকবে।' 

এদিকে বিসিবি সভাপতি ও পরিচালকদের সঙ্গে এভাবে খোলামেলা আলোচনা করতে পেরে খুশি ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন কুমার দাস গুরুত্ব দিয়েছেন ধারাবাহিকতা ও প্রক্রিয়ার ওপর। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন মাঠে খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রম সবাই দেখে। তবে এর পেছনের প্রক্রিয়া অনেকের চোখে পড়ে না। মূল বিষয় হলো সততার সঙ্গে চেষ্টা করা এবং যাত্রাপথে আস্থা রাখা। মনোযোগ ধরে রাখা গেলে এর ফল অবশ্যই আসবে। 

বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছেন, খেলোয়াড়দের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সারাবছর ভালো সহায়তা পাওয়া। এজন্য স্থানীয় সাপোর্ট স্টাফদের উন্নয়ন ও দক্ষতা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বিদ্যমান অভিজ্ঞতা ও সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। এই দুই দিক একত্রিত হলে খেলোয়াড়দের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হবে, তাতে পারফরম্যান্স আরও উন্নত হবে।

জাতীয় দলের প্রধান কোচ ফিল সিমন্স মনে করেন, জাতীয় দলই বাংলাদেশের ক্রিকেটের আসল প্রতীক। এখানে যে প্রতিভা আছে, তা অসাধারণ। কঠোর পরিশ্রমের দিক থেকেও দলটি অনন্য। তবে প্রতিভা ও পরিশ্রম যথেষ্ট নয়, এগুলোকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে হবে ঐক্য ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। তার ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন একসঙ্গে কাজ করা, একে অপরকে সহায়তা করা এবং যৌথ লক্ষ্য ঠিক রাখা। তাহলেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে।