দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার। এদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নারী এবং ৪৯ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে অনেকের মাঝেই নানারকম মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এর তীব্রতা বেড়ে গেলে একসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্ণতা তৈরি হয়; এমনকি কখনো কখনো আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।
গতকাল শনিবার অনলাইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য'-শীর্ষক সমীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। আয়োজক সংগঠনটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য এবং তার মানসিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে এই গবেষণা পরিচালনা করে। আঁচল ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সচেতনতা, সহানুভূতি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বাকি ১৯ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মেডিক্যাল কলেজের।
বৈষম্যের ধরণ: প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা পরীক্ষায় ফলাফলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। অর্থাৎ, পরীক্ষায় যে ফলাফল পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল আশানুরূপ ফলাফল তারা পাননি এবং এক্ষেত্রে শিক্ষকের ব্যক্তিগত আবেগ, রাগ, অনুরাগ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এছাড়া, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ধর্মীয় এবং শারীরিক অক্ষমতাও কারণেও বৈষম্যে শিকার হয়েছেন।
বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যা ৬০ শতাংশ। ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডরমিটরিতে এবং ৩৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইভেন্টে। ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বন্ধু বান্ধবদের আড্ডায় তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮.০৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০.৬৫ শতাংশ। শিক্ষার্থীরা বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার সহপাঠীদের দ্বারা, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। শিক্ষক কর্তৃক এ ধরনের আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন।
বৈষম্যের কারণে মানসিক প্রতিক্রিয়া: বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। এদের মাঝে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, এ ধরনের আচরণের প্রভাব তাদের ওপর গুরুতরভাবে পড়েছে, মোটামুটি প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৬.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন কোনো প্রভাব পড়েনি।
যে ধরনের প্রভাব পড়েছে: ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্ণতার লক্ষণ অনুভব করছেন, উদ্বিগ্নতা অনুভব করেছেন ৪৯ শতাংশ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩০ শতাংশের মধ্যে। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা বেড়েছে, স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করছেন ৪৭শতাংশ। ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেছেন এবং ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান তারা হীনম্মন্যতায় ভুগছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত কি না: মাত্র ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সেবা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, আইনজীবী হাবিবুর রহমান, পার্সপেক্টিভের নির্বাহী সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জুলাই অ্যাক্টিভিস্ট জাহিদ হাসান এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।
প্রসঙ্গত, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে সর্বমোট ১১৭৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।