সমুদ্রযাত্রীদের পথপ্রদর্শক পানকৌড়ি

রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ পানকৌড়িদের দীর্ঘায়ু কামনা করে লিখে গেছেন, ‘...মানুষ ঘুমায়ে থাক—এ সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাক কাচপোকা মাছরাঙা/ পানকৌড়ি দোয়েল চড়াই...।’ আর ‘ছেলেভুলানো ছড়া’য় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘...পানকৌড়ি পানকৌড়ি ডাঙায় ওঠো’ সে/ তোমার শাশুড়ি বলে গেছে বেগুন কোটো’ সে...।’ ছান্দসিক কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দেও ঝংকার তুলেছে পানকৌড়ি, ‘...চুপ চুপ—ওই ডুব/ দ্যায় পান্ কৌটি/ দ্যায় ডুব টুপ টুপ/ ঘোমটার বৌটি!’ প্রাণপ্রকৃতি আর অনুভূতির গভীরতা থেকে কবি আল মাহমুদও তার গল্পগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ‘পানকৌড়ির রক্ত চাই’। ইংরেজি সাহিত্যে পানকৌড়ি হয়ে আছে ‘অতৃপ্ত ক্ষুধা ও লোভের’ প্রতীক। আর চীন ও জাপানি সাহিত্যিকরা পাখিটির চিত্র এঁকেছেন ‘জেলেদের সহযোগী, দুঃখ, নিয়তি’ হিসেবে।

পানকৌড়ির ‘পান’ শব্দের অর্থ পানি বা জল আর ‘কৌড়ি’ মানে কাক বা কাকসদৃশ্য পাখি। দেখতে ঠিক কাকের মতো হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে এর আরেক নাম ‘জলকাক’। পানকৌড়ির ইংরেজি নাম ‘কর্মোরান্ট’ এসেছে ল্যাটিন ‘কারভাস ম্যারিনাস’ থেকে।     

যার অর্থ ‘সমুদ্রের কাক’। স্ক্যান্ডিনেভীয় নর্স পুরাণ মতে, পানকৌড়ি ‘সমুদ্রযাত্রীদের পথপ্রদর্শক’, চীন ও জাপানের লোকবিশ্বাসে ‘মাছ ধরার দেবতার দূত’ আর আইসল্যান্ডে ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা’। তবে প্রচুর মাছ খাওয়ার কারণে মধ্যযুগীয় ইউরোপে পানকৌড়ি ‘শয়তানের পাখি’ আর দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশে নিন্দিত হয়েছে ‘লোভী পাখি’ হিসেবে। কোথাও কোথাও অবশ্য পানকৌড়ির উপস্থিতিকে বেশি মাছ পাওয়ার সংকেত বলে ধরা হয়।

বিবর্তন

পানকৌড়ি ‘ফ্যালাক্রোকোরাসিডি’ পরিবারভুক্ত পাখি, যাদের অস্তিত্ব আড়াই থেকে ৩ কোটি বছর আগে অলিগোসিন যুগে দেখা যায়। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া মায়োসিন যুগের পানকৌড়িসদৃশ পাখির ফসিল থেকে ধারণা করা হয়, সেগুলোই ছিল জলজ পরিবেশে অভিযোজিত আধুনিক পানকৌড়ির আদিপুরুষ। ডুব দিয়ে মাছ ধরার ক্ষমতা, লম্বা ঘাড়, বাঁকানো ঠোঁট, জালযুক্ত পা—সবই বিবর্তনের মাধ্যমে সে যুগেই তৈরি হয়েছিল। যারা পানির নিচে ডুব দিয়ে সহজে ভারসাম্য রাখতে পারে। যাদের প্রথম বিকাশ ঘটেছিল দক্ষিণ গোলার্ধে। পরে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকায়। বর্তমানে ৪০টিরও বেশি প্রজাতি আছে পানকৌড়ির।

ইতিহাস

প্রায় ১৩০০ বছর আগে প্রাচীন চীন ও জাপানে পানকৌড়িকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রথম মাছ ধরার কাজে ব্যবহার শুরু হয়। তখন বড় মাছ যেন গিলতে না পারে সেজন্য এর গলায় আংটি পরিয়ে দেওয়া হতো। ধরা মাছ জেলেদের হাতে তুলে দিতে হতো। মধ্যযুগে ইউরোপে পানকৌড়ি ‘রাজকীয় শিকার-পাখি’র স্বীকৃতি পেয়েছিল। ইংল্যান্ডে ১৭শ শতকে রাজা জেমস প্রথম পানকৌড়িকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে মাছ ধরাতেন। এজন্য ‘মাস্টার অব দ্য কোরমোরান্টস’ও নিযুক্ত করেছিলেন। আধুনিক যুগে বিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা—সব দেশ ও অঞ্চলের জেলেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হলেও পরিবেশের ভারসাম্যে পানকৌড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বৈশিষ্ট্য

মাঝারি আকারের জলচর পানকৌড়ির দেহ কালচে বা কালো। গলা ও বুক কিছুটা ফ্যাকাশে। ডানা লম্বা ও শক্তিশালী, উড়তে ও ভেসে থাকার উপযোগী। পালক আধাজলরোধী। শিকার শেষে শরীর শুকানোর জন্য ডানা মেলে বসে থাকতে দেখা যায়। জালযুক্ত পা সাঁতারের জন্য দারুণ উপযোগী। ঠোঁট লম্বাটে ও বাঁকা, পানির নিচে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করায় দক্ষ। নদী, হাওর, বিল, পুকুর, খাল, বাঁওড়সহ যে কোনো জলাশয়ে পানকৌড়িদের দেখা মেলে। বাংলাদেশসহ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। প্রধান খাদ্য মাছ। পানির নিচে ১-২ মিনিট পর্যন্ত সাঁতার কেটে মাছ ধরে। কখনো ছোট ব্যাঙ বা জলজ প্রাণীও খেয়ে থাকে। গাছে বা ঝোপে ডালপালা দিয়ে বাসা বানায়। একসঙ্গে সাধারণত ৩-৫টি ডিম পাড়ে। পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই ডিমে তা দেয় ও ছানাদের খাবার জোগায়।

পরিবেশে ভূমিকা

শুধু মাছ খাওয়াই নয়, পানকৌড়ি পরিবেশে বড় ভূমিকাও রাখে। প্রচুর পরিমাণে ছোট ও দুর্বল মাছ খেয়ে মাছের প্রজননক্ষমতা বাড়ায়। ফলে জলাশয়ের মাছের প্রজাতিগত ভারসাম্য বজায় থাকে। জলজ খাদ্যজালের মধ্যস্তরের শিকারি এই পাখি যেমন মাছ খায়, তেমনি এদেরও আবার শিকার করে শকুন, ইগল, বড় শিকারি প্রাণী বা মানুষ। ফলে বাস্তুতন্ত্রের শক্তিপ্রবাহ সুষম থাকে। পানকৌড়ির বিষ্ঠা প্রচুর নাইট্রোজেন ও ফসফরাসসমৃদ্ধ, যা মাটিকে উর্বর করে তোলে। উদ্ভিদ ও জলজ শৈবালের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। বিশেষত দ্বীপ ও হাওরাঞ্চলের গাছপালায় এই সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে পানকৌড়ি

দেশে পানকৌড়ির প্রজাতি প্রধানত তিনটি। বড় পানকৌড়ি আকারে প্রায় ৮০-১০০ সেন্টিমিটার লম্বা। যাদের নদী, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। ছোট পানকৌড়ি আকারে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার। যারা পুকুর, খাল আর গ্রামীণ জলাশয়ে বেশি থাকে। তৃতীয় প্রজাতির গলাফুলা বা ভারতীয় পানকৌড়ির আকার মাঝারি। এদের গলা সরু। নীলচে চোখের জন্য আলাদা করে চেনা যায়। মিঠাপানির হ্রদ ও নদীতে এদের বিচরণ বেশি। দেশের প্রায় সব হাওর-বাঁওড়, নদী, খাল, বিল, পুকুর ও উপকূলীয় অঞ্চলে এদের প্রধান আবাস। তবে সিলেটের হাওরাঞ্চল, বরিশালের নদীপাড়, সুন্দরবন ও কক্সবাজার উপকূলে প্রচুর পানকৌড়ির দেখা মেলে—যারা গাছে বা বাঁশঝাড়ে উপনিবেশ করে বাসা বানায়।

প্রাচীনকালে বাংলাদেশ, চীন ও জাপানে পানকৌড়ি মানুষকে মাছ ধরায় সাহায্য করত। আজও অনেক এলাকায় পোষা পানকৌড়ি দিয়ে মাছ ধরা হয়, যা পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। ফলে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের আকর্ষণ হতে পারে পানকৌড়ি। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃতিপ্রেমী ও পক্ষীবিশারদদের কাছে এই পাখি রীতিমতো গবেষণার উপাদান। লোককথায়, গানে ও কবিতায় পানকৌড়ির দারুণ উপস্থিতি। ফলে সাংস্কৃতিক পর্যটন বা লোকসংস্কৃতির পণ্যায়নে এর ভূমিকাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।