বাংলাদেশের বর্তমান বেকারত্ব পরিস্থিতি, বিশেষত শিক্ষিত তরুণসমাজের কর্মসংস্থানের সংকট এক নূতন অশনিসংকেত বহন করিতেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপে (২০২৪) দেখা গিয়াছে, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ ৮৫ হাজারে দাঁড়াইয়াছে। স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যাহা পূর্বের বৎসরের তুলনায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। চিন্তার বিষয় হইল, জাতীয় বেকারত্বের সামগ্রিক হার যেইখানে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, সেইখানে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট বহু শতাংশ বেশি।
এই ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক স্পষ্ট করিয়া জানাইয়াছেন-সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় নাই। একদিকে রাষ্ট্রের সীমিত নিয়োগ প্রক্রিয়া, অন্যদিকে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির ধীরগতি-উভয় কারণে সামগ্রিকভাবে একটি বিরূপ অবস্থা সৃষ্টি হইয়াছে। বিনিয়োগ বাড়িতেছে না, অথচ কেবল জিডিপির পরিসংখ্যান দেখাইয়া প্রবৃদ্ধির সাফল্যের বুলি আওড়ানো হইতেছে। প্রশ্ন জাগে, যখন বিনিয়োগের প্রসার ঘটিতেছে না, তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িবে কী করিয়া?
এই প্রশ্নের উত্তর লুক্কায়িত আছে আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে। উন্নত দেশের সরকারসমূহের অন্যতম প্রধান সাফল্যের মাপকাঠি হইল, তাহারা কতখানি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিতে সক্ষম হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাইতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা। ২০০৮ সালের ভয়াবহ মন্দার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার 'স্টিমুলাস প্যাকেজ' হিসাবে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে। ফলত ২০১০ থেকে ২০২০-এর মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রায় ২ কোটি নূতন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ইউরোপের জার্মানি-নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশেও একইভাবে শ্রমবাজারকে শক্তিশালী রাখিবার জন্য উদ্ভাবনী শিল্পনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার গ্রহণ করা হয়। অতএব সাফল্যের মূল চাবিকাঠি কোথায়, তাহা স্পষ্ট-রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হইতে হইবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কেবল কাগুজে প্রবৃদ্ধি নহে।
তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে ছবিটি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আমরা দেখিতেছি, উচ্চশিক্ষাসম্পন্ন বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী চাকরির সুযোগ না পাইয়া হতাশায় নিমজ্জিত হইতেছে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হইল দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করা, কিন্তু যখন বাজারে তাহাদের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র থাকিতেছে না, তখন তাহা এক অদৃশ্য সামাজিক বিস্ফোরণের ভিত্তি প্রস্তুত করিতেছে। ইতিহাস সাক্ষী, কর্মসংস্থানের অভাব হইলেই সমাজে অশান্তি ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়াছে। আরব বসন্তের সূচনা হইয়াছিল মূলত শিক্ষিত বেকার যুবকদের হতাশা হইতে। রাষ্ট্র যদি তাহাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার ব্যবস্থা করিতে ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে গণঅভ্যুত্থান ও গণবিদ্রোহ পুনরায় আবির্ভূত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এখানে আর একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিনিয়োগের পরিবেশ যদি ইতিবাচক না হয়, তাহা হইলে দেশি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী কেহই নূতন উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী হইবেন না। বিনিয়োগের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা যদি সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, তাহা হইলে বিদেশি মূলধন তো দূরে থাক, দেশীয় উদ্যোক্তারাও পুঁজি বিনিয়োগে বিরত থাকিবেন। এই কথাই সিপিডির নির্বাহী পরিচালক যথার্থভাবে স্মরণ করাইয়াছেন-দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়িলে কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়িবে?
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাহাদের হাতে, তাহাদের বুঝিতে হইবে, কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক সূচকের অংশ নহে, ইহা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ও পূর্বশর্ত। সুতরাং যাহারা শাসক, যাহারা রাজনীতিক, যাহারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বহন করিতেছেন-তাহাদের বুঝিতে হইবে, কর্মসংস্থানের বিস্তার, বিনিয়োগের ইতিবাচক পরিবেশ, ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুস্থ বিকাশ-এই তিনটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকারে না রাখিলে অন্য কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হইবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তরুণদের হাতে যদি কর্ম থাকে, তাহারা দেশ গড়িতে প্রাণপাত করে। কিন্তু যদি কর্মহীনতার দগদগে ক্ষত তাহাদের জীবনে অস্থির করিয়া দেয়, তাহা হইলে সেই ক্ষতই পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানের আগুনে। কর্মসংস্থানের অভাবেই দেশে দেশে গণঅভ্যুত্থান, গণবিদ্রোহ বারংবার ফিরিয়া আসিবে-এই সহজ সত্য বুঝিতে হইবে।