জীবন যখন ‘ষোলো আনাই মিছে’

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের জলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-ডোবা ইত্যাদি থাকিবে ইহাই স্বাভাবিক। এইসব উপাদান আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার জন্য সহায়ক। তবে এইসব জলাধারের কারণে অনেক সময় যেসব বিপদ ঘটে, তাহার অন্যতম হইল পানিতে ডুবিয়া  মৃত্যুবরণ। ইদানীং দেশে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীর পানিতে ডুবিয়া মরিয়া যাইবার হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়িতেছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা সমুদ্রসৈকত ও নদ-নদীতে ঘুরিতে বা গোসল করিতে গিয়া সলিল সমাধির শিকার হইতেছে। ইহার কারণ— সাঁতার না জানা, সাঁতার শিক্ষার ওপর জোর না দেওয়া ও সচেতনতার অভাব। সাম্প্রতিককালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাঁতার শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করিলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাহার তেমন কোনো প্রভাব পড়িতেছে না। কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের না হয় সাঁতার শিক্ষা দিয়া ও সচেতন করিয়া রক্ষা করা যাইবে; কিন্তু অবুঝ শিশুদের ক্ষেত্রে কী হইবে?

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি বত্সর প্রায় ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যায়। প্রতিদিন মারা যায় ৪০ শিশু। এই ধরনের মৃত্যু হার তিনগুণ বেশি বরিশাল বিভাগে, যেহেতু এই বিভাগ নদ-নদী ও খাল-বিল দ্বারা পরিবেষ্টিত। যদিও আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী  দেশ ভারতে পানিতে ডুবিয়া মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক; কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশেই এই হার বেশি। দেশে প্রতি লাখে এক হইতে চার বত্সর বয়সি ৭১-৭২ জন শিশুর মৃত্যু হয়! পানিতে ডুবিয়া শিশুর এই মৃত্যু কতটা উদ্বেগজনক তাহা বোধগম্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুুকুরে ডুবিয়াই এই শিশুরা মারা যাইতেছে এবং এই মৃত্যুর ৮০ ভাগই ঘটে বাড়ি হইতে ২০ মিটারের মধ্যে।

এই মৃত্যু ঠেকাইতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা। কিশোর-তরুণদের পানিতে ডুবিয়া মৃত্যুর হার হ্রাস করিতে হইলে সাঁতার শিক্ষার বিষয়টি শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া এই সমস্যা যেহেতু শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তাই এখানকার স্কুল-কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাঁতার অবশ্যই তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে পানিতে ডুবিয়া শিশু মৃত্যু হার কমাইতে হইলে দুই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যাইতে পারে। প্রথমত পাঁচ বত্সরের কম বয়সি শিশুদের সঠিক তত্ত্বাবধানে রাখিতে হইবে। সকাল ৯টা হইতে একটার মধ্যে এই ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কেননা এই সময় মা রান্নাবান্নার কাজে এবং বাবা কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকেন। ভাইবোনেরা থাকে স্কুলে। এইজন্য এই সময়টায় কমবয়সি শিশুকে চোখে চোখে রাখিতে হইবে। দ্বিতীয়ত পাঁচ বত্সরের বেশি শিশুদের অবশ্যই সাঁতার শিখাইতে হইবে। সাঁতার একটি ভালো ব্যায়াম। তাই সাঁতার অনুশীলনের জন্য বিশেষত শহর-নগরে পর্যাপ্ত সুইমিং পুল গড়িয়া তোলা আবশ্যক। ইহার গুরুত্ব অপরিসীম। এইজন্য কবি সুকুমার রায়ের ‘জীবনের হিসেব’ কবিতায় দেখা যায়, বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাইয়ের জ্ঞানগর্ভ নানা প্রশ্নবাণ শেষে ঝড় উঠিয়া নৌকা ডুবিবার উপক্রম হইলে বৃদ্ধ মাঝি জিজ্ঞ্যেস করেন- ‘মাঝি শুধায়, সাঁতার জানো?’— মাথা নাড়েন বাবু,/ মূর্খ মাঝি বলে, ‘মশাই এখন কেন কাবু?/ বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,/ তোমার দেখি জীবন খানা ষোলো আনাই মিছে!’। অতএব সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যই সাঁতার শিক্ষা অপরিহার্য।