প্রাণিজগত্

সুন্দরবনে বাঘ ভালো থাক

 

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা মাংসাশী প্রাণী বাঘকে বাঁচাতে ও সচেতনতা সৃষ্টিতে সারা বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশও পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। দেশে সুন্দরবন বাঘের একমাত্র আবাসস্থল। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বাঘ সমৃদ্ধ ১৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণকে বেগবান করতে যে ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়, তারই আলোকে প্রতিবছর বাঘ দিবস পালন করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষা, অবৈধ শিকার ও হত্যা বন্ধ এবং বাঘ সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। ‘সুন্দরবনের বাঘ জরিপের ফলাফল ঘোষণা ও সেকেন্ড ফেইজ: স্ট্যাটাস অব টাইগারস ইন বাংলাদেশ সুন্দরবন ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা করেছিল বন বিভাগ। বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। সে সময় তাদের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব ছিল প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ২.১৭টি। নতুন জরিপে বাঘের এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪টি, যা ২০১৮ সালে করা। তিনটি রেঞ্জের তিনটি ব্লকের ১৬৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিশেষ ধরনের ক্যামেরা দিয়ে এ জরিপ চালানো হয়। জরিপে বন বিভাগ এবার ৬৩টি পূর্ণবয়স্ক, চারটি জুভেনাইল, পাঁচটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বাঘের ২৪৬৬টি ছবি পেয়েছে। এ ছবিগুলো যাচাই করেই বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসইসিআর মডেলে তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাঘের আপেক্ষিক ঘনত্ব পাওয়া গেছে ২.৫৫+০.৩২। সুন্দরবনের বাঘের বিচরণক্ষেত্র ৪৪৬৪ কিলোমিটার এলাকাকে আপেক্ষিক ঘনত্ব দিয়ে গুণ করে বাঘের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে ১১৪টি। জরিপে বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩.৩৩টি। এই জরিপে বন বিভাগকে সহযোগিতা করেছে ওয়াইল্ড টিম, যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথ সোনিয়ান কনজারভেশন বায়োলজি ইন্সটিটিউট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

১০০ বছর আগে পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা ছিল এক লাখ। গত এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রাণিসংরক্ষণবিদরা জানিয়েছেন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড ও গ্লোবাল টাইগার ফোরাম জানিয়েছে, সর্বশেষ বিশ্ব শুমারিতে ৩৮৯০টি বাঘের সন্ধান পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গণনায় দেখা গেছে, বিশ্বে মোট বাঘের অর্ধেকেরও বেশি ভারতে রয়েছে, যার সংখ্যা ২২২৬। একসময় বিশ্বে আট প্রজাতির বাঘের পদচারণা ছিল সর্বত্র। প্রজাতিগুলো হলো—রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সাইবেরিয়ান বাঘ, ইন্দো চাইনিজ বাঘ, কাশিয়ান বাঘ, জাভান বাঘ, সুমাত্রান বাঘ, দক্ষিণ চীনা বাঘ ও বালি বাঘ। এর মধ্যে বালি বাঘ, জাভান বাঘ ও দক্ষিণ চীনা বাঘ বিলুপ্তির পথে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তিন পরিস্থিতিতে বাঘ লোকালয়ে এসে মারা পড়ে। প্রথমত, বাঘ যে এলাকায় থাকে সে এলাকায় খাদ্যের অভাব। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা বাঘ দুই থেকে আড়াই বছর বয়সে মাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে যায়। এ সময় বাঘ তার নিজস্ব এলাকা নির্ধারণের জন্য এলাকা খুঁজতে খুঁজতে বনের বাইরে আসতে পারে। তৃতীয়ত, বৃদ্ধ হয়ে গেলে বা অসুস্থ হলে বাঘ তার নিজ এলাকা হারিয়ে ফেলে। তখন বাঘ খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে বাঘ লোকালয়ে আসার ঘটনা বেশি ঘটে। বিশ্বে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাঘের আবাসস্থল বাংলাদেশের সুন্দরবন। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বদলে যাওয়ায় বাঘের জীবনচক্র বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বাঘের জীবনচক্রের জন্য সুন্দরবনে যে স্বাদুপানি, নিরুপদ্রব, নিরাপদ প্রজনন ব্যবস্থা থাকা দরকার, বর্তমানে তার কোনোটাই যথেষ্ট নয়।

বাঘ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক রক্ষক। বাঘ কমলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর হুমকি বাড়বে। তাই শুধু বাঘ নয়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এবং সেইসঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের আরো বেশি উদ্যোগী হতে হবে।