বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন ড. মৃত্যুঞ্জয় আচার্য্য

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিমণ্ডলে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছেন। তাঁদেরই একজন হলেন ড. মৃত্যুঞ্জয় আচার্য্য, বর্তমানে তিনি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রক্টর হিসেবে কর্মরত। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে জড়িত থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

ড. মৃত্যুঞ্জয় আচার্য্যের শৈশব থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি ছিল প্রবল অনুরাগ। পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর কৌতূহলী মন তাঁকে গবেষণার ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। বিদ্যালয় ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি জীববিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি গবেষণার প্রতি আগ্রহ তাঁকে একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে।

গবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

২০০৮ সালের নভেম্বরে তিনি যুক্ত হন জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (JICA)-এর সঙ্গে ফিল্ড রিসার্চার হিসেবে। মাঠপর্যায়ের গবেষণার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার মজবুত ভিত গড়ে দেয়।

পিএইচডি ও উচ্চশিক্ষা

তাঁর গবেষণার যাত্রা থেমে থাকেনি। ড. আচার্য্য ভর্তি হন জাপানের শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট স্কুলে। সেখান থেকে তিনি মলিকুলার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি তিনি মেরিন বায়োলজি ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব বিষয়ে এক বছরের একটি বিশেষ ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এর ফলে তিনি শুধু ল্যাবরেটরি গবেষণায় নয়, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের প্রেক্ষাপটেও বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

গবেষণা, প্রকাশনা ও স্বীকৃতি

এখন পর্যন্ত ড. আচার্য্য প্রায় ৯০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউ জার্নালে রয়েছে ৭৯টি এবং জাতীয় পর্যায়ে ১১টি। তাঁর গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশিত হয়েছে Scopus, PubMed, SCI, Web of Science, Elsevier, Springer, Wiley Journal সহ শীর্ষস্থানীয় জার্নালে।

তাঁর গবেষণার প্রভাবের প্রমাণ: Total Citations: 1706, h-index: 21, i10-index: 33, Institution ranking: 1, Country ranking: দেশের গবেষকদের মধ্যে শীর্ষ ৪%-এর মধ্যে, Asia ranking: শীর্ষ ১২%-এর মধ্যে, এছাড়া তিনি Frontier in Microbiology, IFRJ, Tzu Chi Medical Journal, International Journal of Food Contamination সহ একাধিক আন্তর্জাতিক জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য। ২০২৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজিস্টস কর্তৃক “তরুণ উদীয়মান বিজ্ঞানী পুরস্কার” অর্জন করেন।

সহকর্মী ও গবেষণা নেটওয়ার্ক

ড. আচার্য্যের গবেষণা সীমাবদ্ধ নয় একক প্রচেষ্টায়। ইতোমধ্যেই তাঁর সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন শতাধিক দেশি-বিদেশি সহকর্মী। এই যৌথ প্রচেষ্টা তাঁর কাজকে করেছে আরও শক্তিশালী ও প্রভাবশালী।

শিক্ষকতা ও প্রেরণা

২০১২ সালের ১৮ আগস্ট থেকে তিনি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নন, বরং শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষ কেবল বইয়ের পাঠ নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র।

দর্শন-ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ড. আচার্য্যের মতে—“মানবকল্যাণই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য।” তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারলেই তারা জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তাঁর গবেষণা দৃষ্টিভঙ্গি আন্তঃবিষয়ক; অণুজীববিদ্যা, আণবিক জীববিজ্ঞান, ন্যানো-বিজ্ঞান, খাদ্যবিজ্ঞান ও পরিবেশবিজ্ঞানকে একত্রে কাজে লাগিয়েই টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। ড. আচার্য্যর স্বপ্ন—বাংলাদেশে জীববিজ্ঞান ও মাইক্রোবায়োলজির গবেষণাকে বিশ্বমানে উন্নীত করা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি তরুণ গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত করতে চান নতুন দিগন্ত।

বাংলাদেশের গবেষণা জগতে ড. মৃত্যুঞ্জয় আচার্য্য এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—জ্ঞানপিপাসা, অদম্য অধ্যবসায় এবং গবেষণার প্রতি গভীর নিষ্ঠা থাকলে বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা নিজেদের প্রমাণ করতে পারেন। ড. আচার্য্য শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা, এক বাতিঘর।