গত শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি কর্মকর্তাদের দ্বারা ব্যবসায়ীদের হয়রানির ঘটনা ঘটিলে কোনো আপস বা সমঝোতায় না গিয়া সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাইতে বলেন। তিনি দোষী কর্মকর্তাদের শক্ত হাতে ধরিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি দেন। একপর্যায়ে তিনি তাহার নিজ বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘অনেকে হজ করতে যায়। হজের মৌসুমে অনেককে ছুটি দিতে হয়। হজ করে আসার পরও তো তাদের স্বভাবের পরিবর্তন হচ্ছে না, আমরা আর কী করতে পারি?’ জনাব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরিয়া সরকারি প্রশাসনে কাজ করিয়া আসিতেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি এমন মন্তব্য করিয়াছেন বলিয়া প্রতীয়মান হয়। তাহার এই মন্তব্যে তিনি একপ্রকার বিস্ময়, হতাশা ও অসহায়ত্ববোধ প্রকাশ করিয়াছেন। যিনি হজ করিয়া আসিয়া নিষ্পাপ হইলেন, তিনি আবার নূতন করিয়া কীভাবে ঘুষ-দুর্নীতি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির মতো অপকর্মে লিপ্ত হইতে পারেন? যাহারা হজ করেন নাই, তাহাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাহারা হজ করিয়া আসিলেন, তাহাদের অনেকের জীবনে কেন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না? এই প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নহে।
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। হজে গিয়া একজন হাজি তাওয়াফ করিয়া কাবা শরিফের গিলাফ ধরিয়া কান্নাকাটি করেন। জীবনের অতীতের পাপকর্ম মোচনের জন্য কায়মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। হজের সফরে হারাম শরিফ, মসজিদুল হারাম, হাতিম, কাবা শরিফের রোকনসমূহ, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহিম, জমজম, সাফা-মারওয়া, আরাফাত, জাবালে রহমত, মুজদালিফা, মসজিদে নামিরা, মিনাসহ এমন কিছু স্থান ও সময় আছে, যে স্থান ও সময়ে দোয়া কবুল হইবার সম্ভাবনা প্রবল। এমনকি হজ বা ওমরাহর জন্য ইহরামের নিয়ত করা হইতে শুরু করিয়া হজ ও ওমরাহ সম্পন্ন করিয়া বাড়িতে ফিরিয়া আসার পরেও ৪০ দিন যাবত্ একজন হাজির দোয়া কবুল হইতে থাকে। এইভাবে একজন হাজি হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতো মাসুম বা নিষ্পাপ ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। আমাদের ধর্মপ্রাণ সমাজে এই কারণে হাজিরা অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। অনেকে নামের আগে ‘আলহাজ’ শব্দটি লাগাইয়া রাজনীতি, সমাজসেবাসহ ব্যবসায়-বাণিজ্যেও সাফল্য লাভ করেন। কিন্তু অনেক সময় ইহার ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
হাদিস শরিফে বলা হইয়াছে, ‘হজে মাবরুরের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই হইতে পারে না’ (বুখারি-১৬৫০, মুসলিম-২৪০৩)। যদি কাহারও হজ কবুল হয়, তাহলে তাহার মতো জান্নাতি ব্যক্তির দ্বারা পুনরায় পাপকর্ম করা কীভাবে সম্ভব? হজ কবুলের নিদর্শনই হইল ইহার মাধ্যমে তাহার জীবনের মোড় ঘুরিয়া যাওয়া। যাহার জীবেন এই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি, তাহার হজ কবুল হওয়ার বিষয়টি সন্দেহমুক্ত নহে। আমাদের মাঝে কেহ কেহ ঘন ঘন হজ ও ওমরাহ আদায় করেন, মক্কা-মদিনার নামিদামি হোটেলে তাহাদের অনেকের সুটও আছে। তাহার পরও আমরা দেখিতে পাই যে, তাহারা নানা রকম অপকর্ম ঠিকই চালাইয়া যাইতেছেন। তাহারা আসলে কী কারণে হজ করেন তাহা তাহারাই ভালো জানেন। হজ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যথানিয়মে আদায় করিলে এমনটি হইবার কথা নহে। সুতরাং এনবিআর চেয়ারম্যানের বিস্ময় প্রকাশ যথার্থ বলিয়াই প্রতীয়মান হয়।