মাইক-মোবাইলের বদলে যোগাযোগ হবে
এই পদ্ধতিতে
শাহীন হাফিজ, বরিশাল অফিস
দেশের সাতটি নৌবন্দর ও নৌযানগুলোতে ভিএইচএফ রেডিও প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য গত মাসে নারায়ণগঞ্জ ডেক ও ইঞ্জিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন মোঃ শাহজাহানকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করেছে বিআইডব্লিউটিএ। ঐ কমিটি ঢাকা, বরিশাল, চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন পূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবে। কমিটির আহ্বায়ক ক্যাপ্টেন মো. শাহজাহান ইত্তেফাককে জানান, ইতিমধ্যেই ভিএইচএফ স্টেশন বসানোর জন্য নৌবন্দরগুলোর সম্ভাব্য স্থান যাচাই-বাছাই করার কাজ শুরু হয়েছে। ভিএইচএফ রক্ষণাবেক্ষণসহ এ প্রযুক্তি ব্যবহারের নানান দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএ এর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা সরকার মিঠু জানান, নৌবন্দরগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় বিআইডব্লিউটিএ’র আওতায় চলাচলরত নৌযানগুলোতে ভিএইচএফ রেডিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিএ নৌবন্দরগুলোতে ভিএইচএফ স্টেশন বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ভিএইচএফ সুবিধা যুক্ত হলে প্রতিটি নৌবন্দরের সঙ্গে নৌযানের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হবে। এছাড়াও যে সকল নৌযানে ভিএইচএফ প্রযুক্তি থাকবে সেসব নৌযানের মাস্টার, ড্রাইভার অপর নৌযানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারবে।
বর্তমানে ভিএইচএফ সুবিধা না থাকায় এক নৌযানের মাস্টার অন্য নৌযানে মাস্টারের উদ্দেশ্যে মাইক দিয়ে বার্তা দেন। যা অনেক সময় অন্য নৌযান পর্যন্ত পৌছায় না। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, মূলত এখন ভিএইচএফ রেডিও ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে নৌযানের মালিক ও কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। ভিএইচএফ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সঙ্গে নৌযানের সার্বক্ষণিক যোগাযোগও নিশ্চিত করা যাবে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে প্রায় ২৩০টি রুটে অসংখ্য নৌযান যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে থাকে। ঈদ সহ বিভিন্ন দিবসে টার্মিনালগুলোতে অধিক যাত্রী যাতায়াত করায় মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপর্যয় ঘটে। সে সময়ে লঞ্চের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। জানা গেছে, নৌযানের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়েনি। এই দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চের নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের সাঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে মোবাইল ফোন। মাঝ নদীতে অনেক সময় মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এতে করে ঢাকা বরিশাল নৌরুটসহ বিভিন্ন রুটে লঞ্চে-লঞ্চে সংঘর্ষ কিংবা বাল্কহেড কার্গোর সঙ্গে লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটছে। নৌযানগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো শতভাগ নিশ্চিত না হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। লঞ্চ চালনায় রাডারের ব্যবহার বহু বছর আগে থেকে হয়ে আসলেও বর্তমানে লঞ্চে জিপিএস, নদীর তলদেশের গভীরতা মাপার জন্য ইকোসাউন্ডার, কুয়াশার জন্য ফগলাইট, জাহাজ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের জন্য ইলেকট্রিক হুইল ব্যবস্থার সংযোজন করার কথা থাকলেও অনেক লঞ্চেই তা পরিপূর্ণভাবে নেই।
একাধিক লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টাররা জানান, নৌপথে শুধু লঞ্চই চলাচল করে না, কার্গো ভ্যাসেল, অয়েল ট্যাংকার, বাল্কহেডসহ নানা ধরনের নৌযান দিন রাতে সমানতালে চলাচল করে থাকে। এগুলোতে ভিএইচএফ, জিপিআরএস, ইকোসাউন্ডার, ফগলাইট, হাইড্রোলিক ও ইলেক্ট্রনিক হইলসহ শতভাগ আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর না হওয়ায় অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি নির্মিত বিলাসবহুল হাতেগোনা কয়েকটি লঞ্চ ছাড়া অপর যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোতে আধুনিক কোনো সরঞ্জামের ব্যবহার নেই। পণ্যবাহী বিভিন্ন ধরনের নৌযানগুলোতেও নেই কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি।
ফারহান-৮ লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মোস্তফা জানান, সকল নৌযানে আধুনিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনা বেড়ে চলছে। বিশেষ করে পানির চাপ কিংবা পানির গভীরতা বুঝতে না পারায় ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ চলাচল করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডাকাতিয়া নদীর চ্যানেল ও মিয়ার চ্যানেলে ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় বিকল্প নৌপথে তিন ঘণ্টার পথ ঘুরে লঞ্চ চালাতে হচ্ছে। মিয়ার চরের পরিবর্তে কালিগঞ্জের যে চ্যানেল ঘুরে যেতে হয় তাও ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে বয়া-বিকন বাতি না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। লঞ্চ চালকরা জানান, গত ১৭ জুলাই রাতে ঝুঁকিপূর্ণ মিয়ারচর এলাকায় ঢাকা থেকে বরিশালগামী সুন্দরবন-১০ ও পারাবত-১১ লঞ্চ একে অপরকে ধাক্কা দিলে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে সুন্দরবন-১০ লঞ্চটি নিচতলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।