বজ্রপাত পূর্বাভাসে আধুনিক ব্যবস্থা

ভরা বর্ষায়ও বজ্রপাতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মানুষের মৃত্যু হইতেছে। বর্তমান বিশ্বে বজ্রপাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে বাংলাদেশে। কিছুদিন পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, হিমালয়ের পাদদেশ হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অতিমাত্রায় বজ্রপাতপ্রবণ দেশে পরিণত হইতেছে। এই ব্যাপারে আবহাওয়াবিদরা মনে করিতেছেন, বিশ্বের উষ্ণায়নের ফলে পরিবেশ আগের তুলনায় উত্তপ্ত অবস্থা হইতে শীতল অবস্থানে আসিতে অধিক সময়ক্ষেপণ করিতেছে। ফলে বাষ্পায়নটা ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িতেছে। আর ইহার ফলেই মেঘ তৈরির তীব্রতায় বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে বলিয়া মনে করেন আবহাওয়াবিদরা। যেহেতু বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবত্সরই বৃদ্ধি পাইতেছে, সেই কারণে পূর্বসতর্কতার মাধ্যমেও বজ্রপাতের হাত হইতে মৃত্যুর হার বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে জাপান পূর্বাভাসের মাধ্যমে মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যে নামাইয়া আনিয়াছে। আরো অনেক দেশেই পূর্বাভাস কেন্দ্র স্থাপন করিয়া বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাইয়া আনা হইয়াছে।

স্বস্তির বিষয় হইল, বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখিতেছে। ইতিপূর্বে ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে। তাহা ছাড়া সারাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাইতে তালগাছ লাগাইবারও উদ্যোগ লইয়াছে সরকার। তবে এখনো অবধি বজ্রপাত হইতে রক্ষা পাইতে সিগন্যালিং বা পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা সম্ভব হয় নাই। অথচ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন— বজ্রপাত যেহেতু সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একটি দুর্যোগ, ইহার হাত হইতে রক্ষা পাইতে ব্যাপকভাবে জনগণকে সচেতন করিয়া তুলিবার পাশাপাশি পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে। পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, ভারতের ওড়িশায় বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ৩১ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হইয়াছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেইখানে বজ্রপাত সংঘটিত হইবার এক ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার মাধ্যমে সেইখানে ছয়টি সেন্সরের সাহায্যে মেঘের অবস্থান, আকৃতি, বাতাসের গতি-প্রকৃতিসহ আবহাওয়ার আরো অনেকগুলো প্যারামিটার খতাইয়া দেখিয়া বলিয়া দিতে পারে কোন এলাকায় বজ্রপাত হইতে পারে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজনের নিকট মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে দুই তিন মিনিটের মধ্যেই সতর্কবার্তা পৌঁছাইয়া যায়। সতর্কতা জারির সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় সাইরেনও বাজানো হয়, যাহাতে লোকজন নিরাপদ স্থানে চলিয়া যাইতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশে এখনো আটটি সনাতন পদ্ধতি বসাইয়া বজ্রপাত পর্যবেক্ষণ করা হয়। ইহার মাধ্যমে কোথায় বা কোন অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, তীব্রতা কতটুকু এবং আকাশ হইতে আকাশে অথবা আকাশ হইতে মাটিতে ঘটা বজ্রপাতের ধরন বিশ্লেষণ করা যায় মাত্র। কিন্তু কখন কোন অঞ্চলে বজ্রপাত হইতে পারে—তাহার পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা সম্ভব হয় নাই। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হইলে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার  অনেকাংশে কমাইয়া আনা যাইবে। সুতরাং আমরা আশা করিতেই পারি, সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণ রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করিবে।