রাজধানীর ১৩টি প্রকল্পে সরকারি জমি অধিগ্রহণের (এলএ) ক্ষেত্রে জমির দাম ও প্রশাসনিক খরচের দেড় শত কোটিরও বেশি টাকা গত ১৬ বত্সরেও জমা হয় নাই ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে। ঐ ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি মন্ত্রণালয়, রেলওয়েসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও দপ্তরের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য এবং আনুষঙ্গিক ও প্রশাসনিক খরচ বাবদ সর্বমোট ১৫১ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা পড়িয়া আছে ঢাকার ডিসির তহবিলে। তবে কেবল ঢাকা ডিসি অফিস এই দায়ে দায়ী নহে। দেশের সকল জেলা প্রশাসকের (ডিসি) তহবিলেই খাসজমি অধিগ্রহণের টাকাও দীর্ঘদিন ধরিয়া অলসভাবে পড়িয়া আছে। ৬৪ জেলার ডিসিদের তহবিলে পড়িয়া থাকা এই টাকা হাজার কোটি ছাড়াইয়া যাইবে।
দেশের সকল খাসজমির মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অধিগ্রহণ করা হয় এই সকল খাসজমি। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার মাধ্যমে সংশ্নিষ্ট সংস্থার অনুকূলে খাসজমি অধিগ্রহণ করা হয়। যেসকল সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের নামে অধিগ্রহণ করা হয়, তাহারা যথাসময়েই সরকারের জমির মূল্য বা সালামি বাবদ টাকা চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করে। ঐ টাকা জমা হয় সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসির তহবিলে। নিয়মানুযায়ী খাসজমি বরাদ্দের টাকা ডিসির তহবিলে জমা হইবার পর তাহা ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে স্থানান্তর করিতে হইবে। কিন্তু, জেলা প্রশাসনগুলির অবহেলার কারণে তাহা পৌঁছাইতেছে না ভূমি মন্ত্রণালয়। ফলে দেশের উন্নয়নমূলক কাজকর্মেও এই টাকাগুলি বিনিয়োগ করা যাইতেছে না। বলা প্রয়োজন, কেবল ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি অধিগ্রহণের সহস্রাধিক কোটি টাকা ডিসি অফিসগুলিতে পড়িয়া নাই; রেল, পূর্তসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। সেইসব টাকাও ডিসিদের তহবিলে পড়িয়া আছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অনুকূলে ব্যক্তিমালিকানাধীন যেইসকল জমি অধিগ্রহণ করা হয় তাহার ক্ষতিপূরণের টাকা ব্যক্তিমালিকদেরকে, কিছু অনিয়ম সত্ত্বেও, মোটামুটি যথাসময়েই পরিশোধ করা হয়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার জন্য অধিগ্রহণকৃত খাসজমির মূল্য বা সেলামির টাকা যথাযথভাবে ডিসির তহবিল হইতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তহবিলে জমা করা হয় না।
ভূমি খাতে বর্তমান সরকারের একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ রহিয়াছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হইল, ম্যানুয়াল ভূমি জরিপের পরিবর্তে ডিজিটাল ভূমি জরিপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় গৃহীত পাইলট প্রকল্প গ্রহণ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ ডাটাবেজে সংরক্ষণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে অনলাইনে উপস্থাপন, অনলাইনে খতিয়ানের নকল উত্তোলনের আবেদন ও নামজারির আবেদন গ্রহণ এবং মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাকে নামজারির অবস্থা অবহিতকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে কৃষি খাসজমি বরাদ্দ, এবং চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন পরিবারগুলির মধ্যে খাসজমি বরাদ্দ ইত্যাদি। তবে এই সকল উদ্যোগ সত্ত্বেও ভূমি খাতে এখনো সুশাসনের ব্যাপক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রহিয়াছে। ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দীর্ঘকাল ডিসিদের তহবিলে অলসভাবে পড়িয়া থাকিবার কোনো মানে হয় না। এরূপ অবহেলা অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকারের উন্নয়নমূলক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা আশা করিব, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি অতি দ্রুত এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।