প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কি পারবেন?

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা গোটা পৃথিবীর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা ব্রিটেনের ইতিহাসখ্যাত সুনাম ও ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ৪০ বছরের বেশি সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার পর ২০১৬ সালের জুনে একটি গণভোট হয়েছিল ব্রিটেনে। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ইউরোপিয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে মত দেন। আর সেখান থেকেই আজকের অস্থিতিশীলতার শুরু। এটা অবশ্যই বিস্ময়ের ব্যপার যে গত তিন বছরে তিনজন নতুন প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখতে হলো। ২০১৬ সালের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। কারণ তিনি নীতিগতভাবে বেক্সিটবিরোধী ছিলেন। ব্রিটিশ তথা পশ্চিমা গণতন্ত্রে এটা এখনো একটি ঐতিহ্য যে নীতিগত প্রশ্নে বা রাজনৈতিক বিরোধ ঘটলে মন্ত্রীরা যখন-তখন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শপথের আগেই বেশ কয়েক জন মন্ত্রী ক্যাবিনেট ছেড়ে যান। ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের পর ব্রেক্সিটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ক্যামেরনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একদিকে ক্রমশ ব্রেক্সিটবিরোধী ব্রিটিশ জনমত এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ব্যর্থ থেরেসা মে উভয় সংকটে নিপতিত হন। বারবার পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি অনুমোদনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। বিক্ষুব্ধ ব্রিটিশ জনগণের আবেগকে উত্তেজিত করে অতিরক্ষণশীল বরিস জনসন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের বিধিবদ্ধ সদস্যদের ভোটে দলীয় প্রধান নির্বাচিত হন। সেজন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, জনসন জনগণের রায়ে প্রধানমন্ত্রী নন। মাত্র ২ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। যে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের দোহাই দিয়ে বরিস প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করলেন, তার সমাধান দেওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। সে কারণেই প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে যে তিনি কি বেক্সিট সংকটের তৃতীয় বলিতে পরিণত হবেন?

প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বরিস জনসন অঙ্গীকার করে বলেছেন যে তারা ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ব্রেক্সিট কার্যকর করতে যাচ্ছেন। তিনি আস্থার সঙ্গে বলেছেন, ব্রেক্সিটের সব সুযোগ-সুবিধাও তারা ভোগ করতে পারবেন। বরিস বলেন, তার নেতৃত্বের মূলমন্ত্র ছিল ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং বিরোধী নেতা জেরেমি করবিনকে পরাজিত করা। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পছন্দের ব্যক্তিত্ব বরিস জনসনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আশা করেছেন ভালো কিছু করবেন তিনি। ব্রিটিশ ঐতিহ্য অনুযায়ী বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বরিস জনসনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন ক্ষমতা গ্রহণ করলেও রক্ষণশীল দলের অনেকেই তার প্রধানমন্ত্রিত্বে কাজ না করার কথা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, অন্তর্জাতিক উন্নয়ন মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে বরিসের আস্থাভাজনদের নিয়ে। সেখানে স্থান পেয়েছেন চরম রক্ষণশীলরা। উদার ব্রিটিশ রাজনৈতিক সমাজ এবং চরমপন্থিদের একটি সাংঘর্ষিক অবস্থান লক্ষ করা যায়। পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, বরিস জনসনকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বেশ চাপের মুখেই কাজ করতে হবে। বহিঃস্থ ক্ষেত্রে তিনি চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই দায়িত্ব নিয়েছেন। সিএনএন তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে জানিয়েছে যে, ইতিপূর্বে ঘোষিত চুক্তি অনুযায়ী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে হবে। কিন্তু বাস্তবে বরিসের হাতে সময় আছে মাত্র ৩০ দিন। থেরেসা মে যা তিন বছরে করতে পারেননি তা বরিসকে করতে হবে ৩০ দিনে। ঐতিহ্য অনুযায়ী পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্য এই সময়ে অবকাশ যাপন করবেন। অন্তত তিন সপ্তাহ পার্লামেন্ট বসবে না। এই সময়ে সাধারণত ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সুতরাং বাস্তবপক্ষে এই অল্প সময়ে অঙ্গীকার বাস্তবায়ন একরকম অসম্ভব হয়ে উঠবে। বরিসের জয়ের মাধ্যমে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সম্ভাব্য সংঘাতের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। জনসনের ঘোষণা মোতাবেক চুক্তি ছাড়াই যদি ব্রেক্সিট কার্যকরী করতে যায়, তাহলে সাংবিধানিক সংকট আরো ঘনীভূত হবে। ব্রিটেনের এমপিরা হুমকি দিয়েছেন, চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বের হবার চেষ্টা করলে তারা বরিস জনসনের পতন ঘটাবেন। এদিকে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী লিও ভারাদকার বলেছেন, চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর করা হলে যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের ঘোষণা যুক্তরাজ্যের ঐক্যের জন্য রীতিমতো হুমকি বলে তিনি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না।’ নতুন প্রধানন্ত্রীর হুমকি যেমন দেশে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও কঠিন বার্তা বহন করছে। বরিস জনসন ইতিমধ্যে দাবি জানিয়েছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রেক্সিট কার্যকর করতে খসড়া চুক্তি থেকে ‘ব্যাকস্টপ’ ধারাটি বাদ দিতে হবে। একই দিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রেক্সিট-বিষয়ক প্রধান মধ্যস্থতাকারী মিশেল বার্নিয়ার ইউরোপীয় নেতাদের একটি বার্তা পাঠান। তাতে বলা হয় ব্যাকস্টপ ধারা প্রত্যাহারের দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরিসের বক্তব্যকে তিনি বেশ আক্রমণাত্মক বলে অভিহিত করেন। ব্যাকস্টপ হলো ব্রেক্সিট কার্যকরী হলেও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার নিশ্চয়তা। এর মধ্যে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্য-শাসিত, অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। ঐতিহাসিকভাবে এই সীমান্ত খুবই স্পর্শকাতর। ব্যাকস্টপ ধারার বিরোধীরা বলছেন, ব্রেক্সিটের পর ঐ সীমান্ত খোলা থাকলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এক ধরনের আইনি দূরত্ব তৈরি হবে। কারণ ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের বাকি তিন অংশ—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাবে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের মনোভাব প্রসঙ্গে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী ভারাদকার বলেন, ‘আপনি যাদের মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী বা মধ্যপন্থি ক্যাথলিক মনে করেন, যারা বর্তমান সামাজিক অবস্থায় খুব সুখী বা অতৃপ্ত, চুক্তিহীন বিচ্ছেদে তারা এক এবং অভিন্ন আয়ারল্যান্ড ধারণার দিকে ঝুঁকবেন।’ ভারাদকার আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় উদারপন্থি প্রতিবাদকারীর সংখ্যা বাড়ছে।’ তারা দেখছে, কার সঙ্গে থেকে তারা স্বস্তি বোধ করছে। এমতাবস্থায় বরিস জনসনের কঠোর মনোভাব ব্রেক্সিট চুক্তির ভবিষ্যেক অনিশ্চিত করে তুলবে এবং ব্যক্তিগতভাবে তা রাজনৈতিক পরাজয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ব্রিটিশ জনগন ব্রেক্সিট ইস্যুতে বরিসের ওপর ভরসা পাচ্ছেন না। গার্ডিয়ান এর একজন কলামিস্ট রাফায়েল বের মনে করেন, জনসনের আমলে ডাউনিং স্ট্রিটের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে এবং জাতীয় অস্বস্তিতে পড়তে পারে যুক্তরাজ্য। এই কলামিস্ট আরো মনে করেন বরিস জনসন সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য থাকলেও সেই বিশৃঙ্খলা খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের হবে না। এর রেশ প্রলম্বিত হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বরিস জনসনকে ‘লোকরঞ্জনবাদী’ বা পপুলিস্ট লিডার বলেই মনে করেন। পৃথিবীব্যাপী যে ধরনের উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটছে, বরিস সম্ভবত তার প্রতিনিধিত্ব করেন। এসব নেতা জাতিকে এক ধরনের ঘোরপ্যাঁচে আবদ্ধ করেন। সর্বকালেই উগ্রবাদের সমর্থক কিছু লোক সর্বত্রই পাওয়া যায়। এরা এ ধরনের লোকদের নিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণি তৈরি করেন। এদের সহায়তায়ই তারা বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন এবং পূর্ব ইউরোপের কোনো কোনো দেশে এ ধরনের নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। বরিস জনসনের বিরুদ্ধে আভিযোগ যে তিনি কট্টরপন্থি। তিনি প্রকাশ্যেই অসত্য ভাষণ দেন। বর্ণবাদীদের মতোই  বক্তব্য পেশ করেন। তার হাবভাব ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে মনে হয় না যে তিনি ব্রিটিশ উদার গণতন্ত্রের উত্তরাধিকারী। ভাষ্যকাররা আশঙ্কা করছেন উগ্রবাদের প্রতিভূ হতে পারেন জনসন। সুতরাং ব্রিটেন সুশাসনের পরিবর্তে কুশাসনের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। বরিস জনসন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংরক্ষণবাদ এবং তথাকথিক ব্রিটিশ আভিজাত্যবাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি অভিবাসন-বিরোধিতায় কট্টর অবস্থানে রয়েছেন। উল্লেখ্য, ব্রেক্সিট ইস্যুতে অভিবাসন একটি সংবেদনশীল বিষয়। ব্রিটেনে ক্রমশ আভিবাসীদের আগমন এবং আবাসন নিয়ে রক্ষণশীলরা উদ্বিগ্ন। আর তাদের উসকে দিয়েছেন বরিস। আবাসনবিরোধী চিন্তাভাবনার প্রথম থেকেই তিনি ব্রেক্সিট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রেক্সিট, উদারতাবাদ এবং চরমবাদের যে দ্বন্দ্ব ব্রিটেনে তৈরি হয়েছে তা থেকে ঐক্যের পথে অগ্রসর হওয়া বরিসের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। বরিস অন্যের জন্য যে খাদ তৈরি করেছেন সে খাদেই তিনি নিপতিত হতে পারেন। তাই প্রশ্ন উঠছে যে তিনি কি তার পূর্বসূরিদের মতো ক্ষণিকের প্রধানমন্ত্রী? সন্দেহটি এতই প্রবল যে আগামী বছর এই সময়ে অর্থাত্ ২০২০ সালের আগস্টে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন কি না তা নিয়ে কলামিস্ট রাফায়েল বের সন্দেহ প্রকাশ করছেন। সেই সঙ্গে আশঙ্কার ব্যাপার এই যে, ব্রিটিশ উদারতাবাদের পরিবর্তে তিনি যদি ট্রাম্প টাইপ রক্ষণশীল মতবাদকে উসকে দিতে পারেন, তাহলে ব্রিটেন হয়ে উঠতে পারে আরেকটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মজার বিষয় হলো ট্রাম্প ও জনসনের কথাবার্তা চালচলন এবং নীতিগত অবস্থানে যথেষ্ট মিল রয়েছে। জনসনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বেশ কয়েক মাস আগে ট্রাম্প তার পক্ষে জোরালো মন্তব্য করে বেশ সমালোচিত হন। তবে বরিস জনসন ট্রাম্প উত্তরাধিকারের জন্য নিজেকে যথেষ্ট গর্বিত মনে করেন। ট্রাম্প তাকে ইতিমধ্যেই ‘ব্রিটেনের ট্রাম্প’ বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ উভয় নেতাকেই লোকরঞ্জনবাদী বলে অভিহিত করেছেন। সত্যি সত্যিই যদি বরিস হয়ে ওঠেন একজন ট্রাম্প, তা গোটা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। গণতন্ত্রের আবাসভূমি গ্রেট ব্রিটেনে এমনটি হবে না বলেই গোটা বিশ্বের মানুষ আশা করতে চায়।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়।