জাতিসংঘের বসতি কর্মসূচির (ইউএন-হ্যাবিটেট) মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শহরে বা 'আরবান' এলাকায় বসবাস করবে। তাই এখন থেকেই প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর উন্নয়ন—যা অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের জীবনমানেরও উন্নতি ঘটাবে। এই ধারণা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার পালন করা হয় বিশ্ব বসতি দিবস, বিশ্ব স্থাপত্য দিবস, এবং মাসের শেষ দিন উদযাপন করা হয় বিশ্ব নগর দিবস। আর এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে পুরো অক্টোবর মাসটিই হয়ে ওঠে 'আরবান অক্টোবর'। টেকসই নগরায়ন নিয়ে কাজ করা স্থপতি, আরবান ডিজাইনার, পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য এটি বিশেষ মাস।
এই উদযাপনকে উপলক্ষ করে স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদের তৈরি নগরকেন্দ্রিক নানা রূপকল্পের প্রদর্শনী, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থপতিদের ভাবনা, ড্যাপ প্রসঙ্গে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা, সংস্কার প্রস্তাব, মতবিনিময়, এবং গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করেছে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই)।
শনিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাস্থই কার্যালয়ের হলরুমে তিনদিনব্যাপী এ আয়োজন শুরু হয়। প্রথমদিনের আয়োজনে ইনস্টিটিউটের সদস্য-স্থপতিদের পাশাপাশি শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিকসহ অনেকে অংশ নেন।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের 'আরবান ডিজাইন' পর্যায়ের নির্বাচিত কিছু প্রকল্প নিয়ে এক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন বাস্থই-এর সাবেক সভাপতি ও প্রখ্যাত স্থপতি জালাল আহমেদ। এসময় অন্য অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন তিনি।
বন্যাপ্রবণ সুনামগঞ্জ এলাকার জন্য দুর্যোগ-সহনশীল নগর-উন্নয়ন ভাবনা, রাজধানীর করাইল বস্তির অভ্যন্তরে অন্তর্ভুক্তি ও অভিযোজনমূলক উন্নয়ন, ট্র্যানজিট অরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সংযোগ, তেজগাঁও শিল্প এলাকার পুনর্বিন্যাসের রূপকল্পসহ টেকসই নগরায়নের বিভিন্ন ধারণা উপস্থাপন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
পরে দুপুর দেড়টায় স্থপতি ইনস্টিটিউটের পরিবেশ ও নগরায়ন বিষয়ক সম্পাদক স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষকরা বক্তব্য দেন। তারা হলেন—এশিয়া প্যাসিফিকের সহযোগী অধ্যাপক ড. নওরোজ ফাতেমী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ মারুফ হোসেন, শাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক ইফতেখার রহমান, স্ট্যামফোর্ডের সহযোগী অধ্যাপক সানিয়া তাবাসসুম, এমআইএসটি'র সহকারী অধ্যাপক ড. সৈয়দা জাফরিনা ন্যান্সি, এশিয়া প্যাসিফিকের সহকারী অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ, এআইইউবি'র সহকারী অধ্যাপক নাজিফা জাবীন সিদ্দিকা, চুয়েটের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা তাসনিম, ডিআইইউ'র সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হক নাঈম, ডুয়েটের প্রভাষক সুনিলা বিনতে আহসান, নর্থসাউথের প্রভাষক আইদা হাসান, সাউথইস্টের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল আমিন।
গোলটেবিল আলোচনায় মূলত দেশের শহর-নগরের উন্নয়নে আরবান ডিজাইনে বিশেষায়িত পেশার ভূমিকা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ করেন তারা। বক্তারা বলেন, উন্নত বিশ্বে শহর-নগরের বিভিন্ন অনুষঙ্গ ডিজাইন করার কাজে এই পেশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় স্থাপত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়ে স্থপতি হওয়া যায়, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় ব্যাচেলর বা মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে আরবান প্ল্যানার হওয়া যায়; কিন্তু আরবান ডিজাইনার হওয়ার বিষয়টি এখনো একটি 'গ্রে এরিয়া'। স্থাপত্যের শিক্ষার্থীরা ব্যাচেলর সম্পন্নের পর বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবান ডিজাইনে মাস্টার্স করার সুযোগ পেলেও দেশে আরবান ডিজাইনে পৃথক উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। আলাদা কর্মক্ষেত্রও নেই। দেশের শহর-নগরের ভবিষ্যতের স্বার্থে এই ক্ষেত্রটি তৈরি করতে হবে।
এরপর বিকাল ৪টায় শুরু হয় 'পরিকল্পনার গঠনমূলক ব্যাতিচার: বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-২০৩৫' শীর্ষক আলোচনা। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি ড. আবু সাঈদ মোস্তাক আহম্মেদের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া। এছাড়া অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক স্থপতি জিয়াউল ইসলাম, স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ খন্দকার এম আনসার হোসেন, ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি ইশতিয়াক জহির তিতাস, স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ নিয়াজ রহমান, বুয়েটের স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ের সাবেক ডিন স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম, এবং রাজউকের পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মাহফুজা আক্তার।
এই সেশনে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) কিছু ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন একদল তরুণ স্থপতি। তারা এ বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে ড্যাপকে হালনাগাদের প্রস্তাব রাখেন। এর মধ্যে ছিল আইন ও বিধিসংক্রান্ত বিষয়; নগর অবকাঠামোর দুর্বল দিক; সুযোগ-সুবিধা ও সেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা; ঢাকার বিভিন্ন ঝুঁকির মানচিত্রায়ন, ঝুঁকি হ্রাসের উপায়; উত্তাপ দ্বীপের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে টেকসই নগর গঠনের রূপরেখা; লাগসই, টেকসই ও সাশ্রয়ী আবাসন বিষয়ক প্রস্তাবনা; ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণের ধারণা, নগরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।
স্থপতি ইনস্টিটিউটের পরিবেশ ও নগরায়ন বিষয়ক সম্পাদক স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক বলেন, একটি শহর মানে শুধু সারি সারি ভবন নয়, বরং মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পরিবেশ ও সম্ভাবনার একটি সম্মিলিত রূপ। আমরা যেন সকলে মিলে একসঙ্গে একটি টেকসই, স্মার্ট ও মানবিক নগর-ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আরবান অক্টোবর উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, এবং বাসযোগ্য নগর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সুচিন্তিত বার্তা দেওয়া।
স্থপতি ইনস্টিটিউটের সেমিনার ও কনভেনশন বিষয়ক সম্পাদক স্থপতি সাইদা আক্তার ছিলেন 'আরবান অক্টোবর'-এর পুরো আয়োজন পরিচালনার দায়িত্বে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের আরবান ডিজাইন প্রকল্প প্রদর্শনী চলবে সোমবার (৩ নভেম্বর) বিকাল পর্যন্ত। আগারগাঁওয়ের বাস্থই ভবনে এ প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত।