শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অতীত ইতিহাসকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। এর আগে এ অঞ্চলে পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো ও পারভেজ মোশাররফ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন—যাদের মধ্যে কেবল ভুট্টোর সাজা কার্যকর হয়। আর মধ্যপ্রাচ্যে আদালতের রায়ে সবচেয়ে আলোচিত মৃত্যুদণ্ড ছিল ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের। রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক শাসন ও যুদ্ধাপরাধ— এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই তিন নেতার বিরুদ্ধে এসব কঠোর রায় কার্যকর বা ঘোষিত হয়েছিল।
পাকিস্তানের দুই প্রাক্তন নেতার মৃত্যুদণ্ড
দক্ষিণ এশিয়ায়, শেখ হাসিনার আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই প্রাক্তন নেতা ছিলেন পাকিস্তানের- জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পারভেজ মোশাররফ। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাদের রায় ঘোষণা করা হয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম প্রাক্তন সরকারপ্রধান ছিলেন পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও ১৯৭৩–১৯৭৭ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে ১৯৭৭ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া–উল–হকের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। দুই বছর পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার অভিযোগে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল রাওয়ালপিন্ডি কারাগারে ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর হয়। পরবর্তীতে ফাঁসির চুয়াল্লিশ বছর পর, ২০২৩ সালের মার্চ মাসে, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করে যে ভুট্টো ন্যায্য বিচার পাননি। প্রধান বিচারপতি কাজী ফয়েজ ঈসা বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া এবং ন্যায্য ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা হয়নি।’ ভুট্টো ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দ্বিতীয় প্রাক্তন পাকিস্তানি নেতা পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এবং ২০০১–২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি ও সংবিধান স্থগিত করার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় তিনি চিকিৎসার জন্য দুবাইয়ে থাকায় সাজাটি কার্যকর হয়নি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অসুস্থতার কারণে তার মৃত্যু হয়।
ঈদের দিন ফাঁসি কার্যকর হয় সাদ্দাম হোসেনের
মধ্যপ্রাচ্যে আদালত কর্তৃক সবচেয়ে আলোচিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি ছিল সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ইরাকের সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর (ঈদুল আজহার দিন) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
১৯৭৯ সাল থেকে ইরাক শাসন করা সাদ্দামকে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে। তার বিরুদ্ধে ১৯৮২ সালে দুজাইলে শিয়া নাগরিকদের গণহত্যা, ১৯৮৮ সালে কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর হালাবজায় রাসায়নিক হামলা এবং কুর্দি এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দামের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা ও গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখা’র অভিযোগ তোলে। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সাদ্দামকে পদত্যাগ করে ইরাক ত্যাগ করার জন্য একটি আল্টিমেটাম দেন। সাদ্দাম সেটি প্রত্যাখ্যান করলে ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ শুরু করে। ২০০৪ সালের জুনে সাদ্দাম গ্রেপ্তার হন, ২০০৫ সালের অক্টোবরে তার বিচার শুরু হয়। পরে ২০০৬ সালের নভেম্বরে রায় ঘোষণা করা হয়- এর কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন, ব্রিটানিকা