স্থানটের প্রতিষ্ঠাতা, সাংবাদিক, সংস্কৃতিজন প্রয়াত প্রাম ওয়াহিদুল হক বলতেন—'সংস্কৃতিই জাগরণের প্রথম সূর্য' । বাংলাদেশের এই সময়ে তার অমীয় বাণী আরো বেশি করে অনুধাবন হচ্ছে। অস্থিরতা, উন্মাদনা, বিশৃঙ্খলা- আমাদের সমাজব্যবস্থার নিত্যকার বিষয়। অথচ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আলোর পথে যাত্রা। যেখানে উন্নতি, অগ্রগতি, আধুনিকতা, ইতিবাচকতা অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে যাবে। কিন্তু আমরা চলেছি পশ্চাতে। পৃথিবী এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে । আর আমরা বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজছি । দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধের বড়ই অভাব । নিজের কাজ, দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার নামই যে দেশপ্রেম, সেটা মানি না। অথচ কথায় কথায় দেশপ্রেমের বুলি ওড়াই । আমাদের পেছন ফেরার আর কোনো অবকাশ নেই । এজন্য ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করাই সময়ের দাবি। সমাজকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে হলে নানা স্তরে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন । এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
সমাজের উন্নতির মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে, কুসংস্কার দূর করে এবং নতুন ধারণা গ্রহণে সহায়তা করে। মানুষ সচেতন হলে নিজেরাই সমাধানের অংশ হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এটি মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও আত্মার জন্ম দেয়। অন্যদিকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, সততা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দেওয়া উচিত সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী হলো নারী। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে ।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং সামগ্রিক সমাজ পরিবর্তনে লাইব্রেরি আন্দোলন একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। লাইব্রেরি আন্দোলন বলতে শুধু নতুন গ্রন্থাগার স্থাপন নয়, বরং বিদ্যমান গ্রন্থাগারগুলোর আধুনিকীকরণ এবং পাঠাভ্যাসকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করাকে বোঝায় । এটি নিশ্চিত করতে কিছু মূল পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন : গ্রন্থাগারগুলোকে আধুনিক কেন্দ্রে পরিণত করা, লাইব্রেরিগুলোকে শুধু বই রাখার জায়গা না রেখে মালটিমিডিয়া সেন্টার, কমিউনিটি লার্নিং হাব এবং বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে । স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের যৌথ উদ্যোগে লাইব্রেরি রক্ষণাবেক্ষণ। ও পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে লাইব্রেরি আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও নীতিগত সমর্থন নিশ্চিত করা জরুরি। লাইব্রেরি আন্দোলন মানুষের জ্ঞানচর্চাকে প্রসারিত করে, সমালোচনামূলক চিন্তাচেতনার বিকাশ ঘটায় এবং একটি আলোকিত ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে সহায়তা করে।
শিক্ষার আলো মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করে এবং সঠিক বিচার-বিবেচনা তৈরি করে । যে কোনো বিষয়কে যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এবং প্রাকৃতিক নিয়মাবলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করে। প্রচলিত বিশ্বাসগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে ভুল ধারণাগুলো দূর করা সম্ভব। সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং সহমর্মিতার মনোভাব কুসংস্কার দূর করে একটি সুষম সমাজ গঠনে সাহায্য করে। ধর্মের মূল শিক্ষাগুলো জেনে গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাস পরিহার করা প্রয়োজন। এই পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করে ব্যক্তি ও সমাজ ধীরে ধীরে অন্ধকার, কুসংস্কার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হতে পারে ।
কুসংস্কার থেকে বিজ্ঞান মানুষকে মুক্ত করতে পারে। যথার্থ শিক্ষা ও যুক্তিবোধ মানুষকে উদার করে । ফলে মানুষের চিন্তা যুক্তিনির্ভর হয় । শিক্ষার অভাব মানুষকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়, আর তখনই কুসংস্কারগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মানুষ বহুদিনের চেষ্টায় বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে এই সভ্যতা গড়ে তুলেছে। কিন্তু অজস্র কুসংস্কার অনেক সময় মানুষের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানকে দিয়েই কুসংস্কারকে প্রতিহত করতে হবে। পাঠ্যসূচিতে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গঠনের ওপর জোর দেওয়া উচিত । বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, মতবিনিময় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা গেলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো হবে। ধর্মীয় নেতারা ধর্মের মূল মানবিক ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষাগুলো প্রচার করবেন এবং ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকবেন। সাংস্কৃতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তরুণদের এই কাজে যুক্ত করা এবং তাদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার মনোভাব তৈরি করা আজ বিশেষ প্রয়োজন।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এটা হতে হবে সঠিক শিক্ষা। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত শিক্ষার নীতিমালাই ঠিক হলো না। কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা, বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যমের মতো বিভিন্ন শিক্ষা ধারায় নানারকম সংকট বিদ্যমান। কিন্ডারগার্টেনগুলোতে সঠিক তদারকি ও নীতিমালার অভাব, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর লাগামহীন পরিচালনা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের অভাব প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ।
এছাড়াও শিক্ষার গুণমান, কারিকুলামের সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোর অভাব রয়েছে । এই বহুমুখী সংকট সমাধানের জন্য, একটি সমন্বিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা সব শিক্ষাধারাকে সমান গুরুত্ব দেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligaice) যুগে কর্মমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিবান্ধব, কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট