জেন-জি বার্নআউট (মনোগত ক্লান্তি): কেন আমরা ৩০-এর আগে ক্লান্ত

আমাদের মাদের বলা হয়—জোয়ান, শক্তিশালী আর সম্ভাবনাময়। কিন্তু বিশের দশকে এসে ফিল্টার করা ছবি আর মোটিভেশনাল পোস্টের পেছনে আমাদের অনেকেই শুধুই ক্লান্ত। এটা সেই সাধারণ ক্লান্তি নয়, যা রাতে ভালো ঘুমালেই ঠিক হয়ে যায়—এটা আরো গভীর এক অবসাদ, যা আবেগের ক্লান্তি আর নীরব হতাশার মধ্যখানে নিঃশব্দে বসে থাকে। 

বাংলাদেশের অনেক তরুণের জন্য, বার্নআউট এখন এক অপ্রকাশিত বাস্তবতা। এটা দেখা দেয় অনুপ্রেরণাহীন, অস্থিরতা, আর ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার ভাবনায়। অনলাইনে এ নিয়ে মজা করি। কিন্তু প্রায় সবাই একই অনুভূতি পাচ্ছে—এটা আর হাসির বিষয় থাকে না।

সমস্যার একটা অংশ আসে যে মেসেজগুলো নিয়ে বড় হয়েছি, সেগুলোই আসলে পরস্পরবিরোধী। বাবা-মায়ের প্রজন্ম বিশ্বাস করত, পরিশ্রমই সফলতার পথ। কিন্তু আমাদের প্রজন্মের বাস্তবতা আলাদা, যেখানে ডিগ্রি থাকলেও চাকরি মেলে না, বেতন বাড়ে না, খরচ বাড়ে দ্রুত। যতই চেষ্টা করি, স্থিতি যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার ওপর, দৃশ্যমান হওয়ার চাপটা আগের চেয়ে বেশি।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সারাক্ষণ মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার বয়সে কেউ একজন ‘বেশি ভালো’ করছে, একজন ফ্ল্যাট কিনছে, আরেক জন স্টার্টআপ চালু করছে, কেউ-বা বিয়ে করে ‘সেটেলড’। তুলনা করি নিজের প্রতিদিনের সংগ্রামকে অন্যের হাইলাইট রিলের সঙ্গে। এ দৌড়ে কেউ কিছু অর্জন করেনি, তবু সবাই যেন জোর করে দৌড়াচ্ছে।

আর কাজের সংস্কৃতিও খুব একটা সহায়তা করেনি। বাংলাদেশের অনেক অফিস এখনো চলে পুরোনো নিয়মে। দীর্ঘ কাজের সময়, কম স্বাধীনতা, আর এক অব্যক্ত নিয়ম—লম্বা সময় কাজে থাকাই যেন ‘হার্ড ওয়ার্ক’। কাজের সংস্কৃতিও খুব একটা সহায়তা করেনি। উৎপাদনশীলতা মাপা হয় উপস্থিতি দিয়ে, কাজের ফলাফল দিয়ে নয়। তরুণ পেশাজীবীরা ২৪/৭হাতের কাছে থাকবেন, এমনটাই আশা; ফ্রিল্যান্সার আর উদ্যোক্তারা অনিয়মিত পেমেন্ট, ট্যাক্স আর অস্থির সিস্টেমের সঙ্গে লড়াই করেন।

এককথায়, আমরা অতিরিক্ত খাটছি, কম বেতন এবং সব সময়ই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে আছি। মনেও অব্যক্ত চাপ জমছে। প্যান্ডামিক আমাদের নিরাপত্তা আর সময়ের হিসেব উলটে দিয়েছে। বন্ধুত্ব ভঙ্গুর, সম্পর্ক জটিল হয়েছে, থেরাপি ব্যয়বহুল বা ট্যাবু। ভালো থাকার যৌথ চাপে মানসিক ক্লান্তি নিঃশব্দে জমছে—অবহেলা করা যায়, যতক্ষণ না তা চরমে পৌঁছায়।

তবু, এক পরিবর্তন আসছে। ধীরে ধীরে তরুণরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সফলতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। উৎপাদনের চেয়ে মনের শান্তিকে মূল্য দিচ্ছে। কেউ রাজধানী অথবা দেশ ছেড়ে শান্তি খুঁজছে, কেউ ছোট, অর্থপূর্ণ লক্ষ্য বেছে নিচ্ছে, কেউ আবার অপরাধবোধ ছাড়াই বিশ্রাম নিতে শিখছে।

এই প্রজন্মের বার্নআউট হয়তো দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং এটা আমাদের সচেতনতার প্রকাশ আমরা শুধু আগের মতো বাঁচতে চাই না, কারণ ‘সবাই এভাবেই করেছে’। আমরা ক্লান্ত অলস বলে নয়, বরং আমরা সত্যিকারের কিছু গড়তে চাই, অর্থবহ কাজ করতে চাই বলেই আর নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে মিল রেখে বাঁচতে চাই।

যদি কিছু হয়, এই ক্লান্তিই হয়তো আমাদের প্রজন্মের সম্মিলিত দরজা খোলার মুহূর্ত। ধীরে চলার, উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার, আর নিজেদের মনে করিয়ে দেওয়ার, 'নিজের মূল্য প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে না'। কারণ ৩০-এর আগে ক্লান্ত হয়ে পড়া আমাদের স্বাভাবিক হওয়া উচিত নয়। এটা হওয়া উচিত পরিবর্তনের শুরু।

লেখক: সিইও, পরিচালক, প্যাস্টি শেফ, ব্যাচেলর অব প্যান্ডি আর্টস, টেইলরস ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি অব টুলুজ, ফ্রান্সের যৌথ ডিগ্রিধারী।