হাস্যকর জরিপ ও পরিসংখ্যানের প্রহেলিকা

বিভিন্ন বিষয়ে পরিচালিত জরিপ বা পোল (poll) প্রায়শই আমাদের মনে নানা প্রশ্ন জাগায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে বহু সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়ে জরিপ পরিচালনা করে: কিন্তু এই জরিপের ফলাফল কি সর্বদা বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি তুলিয়া ধরে? অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময়ই তাহা হাস্যকর, অসংলগ্ন ও চূড়ান্তভাবে বিভ্রান্তিকর হইয়া উঠে। অধিকাংশ জরিপের নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতিই ইহার গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা লইয়া বড় প্রশ্নের অবতারণা করে। একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মনোভাব বুঝিতে মাত্র কয়েক হাজার বা কিছুসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ দেখানো হয়। এমনকি অনেক সময় নির্ধারিত শ্রেণি, বয়স বা পেশার গণ্ডির বাহিরে সেই দেশের একটি বিশাল অংশ তথা ৩০ শতাংশ, ৪০ শতাংশ বা তাহারও অধিক মানুষের মতামত ইহাতে প্রতিফলিত হয় না, অথবা তাহাদের বাদ রাখা হয়। অথচ ফলাফল এমনভাবে প্রকাশ করা হয় যেন সেই দেশের সকল স্তরের মানুষ একই মনোভাব পোষণ করেন।

যদি একটি জরিপ দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে হিসাবেই না আনে, তাহা হইলে সেই ফলাফলকে কীভাবে সার্বজনীন বা প্রতিনিধিত্বমূলক বলা চলে? এমন পরিস্থিতিতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এই বিশাল অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়াই জরিপ পরিচালিত হইয়াছে। একই বিষয়ে একাধিক বিখ্যাত জরিপ সংস্থার ফলাফলে যখন আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তাহারা বুঝিয়া উঠিতে পারেন না যে, কোন জরিপটি সঠিক, বা কোন পরিসংখ্যানের উপর আস্থা রাখিবেন। অনেক সময় জরিপের ফলাফল বাস্তবে দেখা যাওয়া পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলিয়া ধরে, যাহা পরিস্থিতিকে আরো হাস্যকর করিয়া তোলে। যেমন, কোনো নির্বাচনে একটি দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পূর্বাভাস দেওয়ার পরেও যদি দেখা যায় সেই দল ব্যাপক ব্যবধানে হারিয়া গিয়াছে, তখন সেই জরিপের পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য লইয়া সন্দেহ জাগা কি অস্বাভাবিক নহে? বিখ্যাত সংস্থাগুলির জরিপ লইয়াও যখন প্রশ্ন উঠে, তখন এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নড়বড়ে হইয়া যায়।

এই সকল বিতর্কিত পরিস্থিতির কারণেই পরিসংখ্যানকে লইয়া একটি বহুল প্রচলিত উক্তি জনপ্রিয়তা পাইয়াছে: 'পরিসংখ্যান নিজেই মিথ্যা'। এই উক্তিটির মূল বক্তব্য হইল-সংখ্যা বা তথ্য মিথ্যা না হইলেও, সেগুলিকে উপস্থাপন বা ব্যাখ্যা করিবার ধরন এবং নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি এমন হইতে পারে যে, ইহা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি বিকৃত বা পক্ষপাতমূলক চিত্র তুলিয়া ধরে। একটি পরিসংখ্যানের পিছনের প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ কে জরিপটি পরিচালনা করিতেছেন, কাহার অর্থায়নে হইতেছে এবং কীভাবে প্রশ্নগুলি তৈরি করা হইয়াছে-তাহাও ফলাফলের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলিতে পারে। তাই প্রায়শই দেখা যায়, পরিসংখ্যানকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বা ধারণা প্রতিষ্ঠা করিবার চেষ্টা করা হইতেছে।

জরিপ ও পরিসংখ্যান অবশ্যই সমাজকে বুঝিতে সাহায্য করে; কিন্তু মনে রাখিতে হইবে-এইগুলি হইল একটি হাতিয়ার মাত্র। এই হাতিয়ার যাহারা ব্যবহার করেন, তাহাদের উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতির ত্রুটির কারণেই ফলাফল বিতর্কিত হয়। সাধারণ মানুষকে তাই প্রতিটি জরিপের ফলাফলকে সন্দেহ ও বিশ্লেষণের চোখে দেখিতে হইবে। ফলাফল গ্রহণের পূর্বে নমুনা আকার, নমুনা পদ্ধতি এবং জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা আবশ্যক। পরিসংখ্যানকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করিয়া, ইহার পিছনের বাস্তবতাকে অনুধাবন করার মাধ্যমেই আমরা এই প্রহেলিকা হইতে মুক্তি পাইতে পারি।