আশাহীন হইয়া বসিয়া থাকিবার সুযোগও নাই

পৃথিবীর যেই কোনো দেশের মানুষের স্বাধীনতার মূল আকাঙ্ক্ষাই হইল—তাহারা ভয়হীন পরিবেশে একটি নিরাপদ জীবনের স্বাদ পাইবে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হইলেও সেই স্বপ্ন এখনো অধরাই রহিয়া গেল । ক্ষমতার চক্রাবর্তে যেই আসুক—ভয় দেখাইবার নীতি যেন অপরিবর্তিতই রহিয়া গিয়াছে। সাধারণ মানুষ জিডিপি বোঝে না—মাথাপিছু আয়ের রেখাচিত্র তাহাদের হৃদয়ে কোনো রেখাপাত করে না। তাহারা কেবল অনুভব করিতে চাহে—সে নিরাপদ কি না। খোলা মনে কথা বলিবার পরিবেশ সে পাইয়াছে কি না ।


অথচ আমরা একই ভাষার, একই সংস্কৃতির, একই মাটির মানুষ হইয়াও দুঃখজনকভাবে পরস্পরকে সহ্য করিবার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলিয়াছি । পরশ্রীকাতরতা এমন এক দানবের রূপ ধারণ করিয়াছে যে, অপরের সাফল্য সহ্য করিতে পারি না । অথচ এই দেশটির পথ চলা এত সহজ ছিল— মাটি উর্বর, ইতিহাসে সংগ্রামের ঐক্যস্মৃতি তীব্র—তবু আমরা নিজেরাই পথটিকে কণ্টকাকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছি।

যদিও সত্য এই যে, স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে অবকাঠামোগত যেই অগ্রগতি হইয়াছে, পৃথিবীর বহু দেশই তাহা দৃষ্টান্তরূপে দেখে। ৬৮ হাজার গ্রামের সঙ্গে রাজধানীর সংযোগ, বড় শহরগুলিতে আকাশচুম্বী অট্টালিকার সারি, গ্রাম-গ্রামান্তরে বৈদ্যুতিক বাতির আলো—ইহা এত সহজ নহে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ যে বৃথা যায় নাই—ইহারই সাক্ষ্য এই উন্নয়ন । তাহা হইলে প্রশ্ন জাগে—যদি পাঁচ দশকে সকলেই চোরই হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই সকল উন্নয়ন সাধন করিল কে? আমরা নিজেরাই নিজেরে অপমান করিতে গিয়া সত্যের ধারেকাছে দাঁড়াইতে ইচ্ছুক নহি । যাহারা যখন ক্ষমতায় আসেন, তাহারা প্রত্যেকেই বাক্‌স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেন——মন খুলিয়া কথা বলুন;' কিন্তু সেই মন খোলা কথাই শাসকের কাছে অসহ্য হইয়া উঠে অনেক সময়। অন্যদিকে আমাদের রাজনৈতিক বিভাজন ও অনৈক্য এখন এমন এক চরম পর্যায়ে উপনীত—যেইখানে অবিশ্বাসের চাষাবাদই যেন প্রধান রাজনীতি। হানাহানি, হামলা-মামলার এমন প্রতিযোগিতা শুরু হইয়াছে যে, সুযোগ পাইলেই কাহাকে কীভাবে অধিক হেনস্তা করা যায়—ইহাই যেন বীরত্বের নূতন সংজ্ঞা ।

এত বিভাজন ও অনৈক্য কি কেবল বাংলাদেশেরই ইতিহাস?—অবশ্যই নহে। পৃথিবীর বহু দেশই অতীতে গভীর বিভক্তির গহ্বরে নিমজ্জিত হইয়াছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা একসময় প্ৰতিবাদ, গৃহযুদ্ধ, বর্ণবিদ্বেষের সর্বনাশায় জর্জরিত ছিল; কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলা বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠিয়া জাতিকে পুনরায় এক করিবার নৈতিক নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। স্পেনের গণতান্ত্রিক উত্তরণে আদলফো সুয়ারেজের ভূমিকা আজও ইতিহাসে প্রশংসিত—তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিত্যাগ করিয়া সমঝোতার পথ খুলিয়া দেন। রুয়ান্ডার ভয়াবহ গণহত্যার পর পল কাগামে সামাজিক পুনর্মিলনের মডেল স্থাপন করিয়া দেখাইয়া দেন—বিভক্ত জাতিও পুনরায় উঠিয়া দাঁড়াইতে পারে। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়া—যেইখানে সামরিক শাসনের অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী ছিল—সেই দেশটিও পার্ক চুং-হি ও পরবর্তী নেতাদের দূরদর্শী কৌশলে শিল্পায়ন, শিক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতি অর্জন করে । এই সকল রাষ্ট্রনায়ক একক ব্যক্তি নহেন—তাহারা যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া জাতিকে অকল্যাণের দোলাচল হইতে মুক্তি দিয়াছেন । তাহারা যদি বিভাজন অব্যাহত রাখিতেন, তাহা হইলে আজও সেই সকল দেশে রক্তপাত, প্রতিশোধ, অন্তর্দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকিত । রাষ্ট্র তখন অগ্রসর হইতে পারিত না । উন্নয়ন, মানবকল্যাণ, স্বাধীনতা—সকল কিছুই হতাশার অন্ধকারে বিলীন হইয়া যাইত । এই জন্য ইহাদের বলা হয় স্টেটসম্যান ।

সুতরাং বাংলাদেশেরও প্রয়োজন সেই রূপ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান, ক্যারিশম্যাটিক রাষ্ট্রনায়ক তথা স্টেটসম্যান—যিনি স্বীয় দলগত পরিসীমাকে অতিক্রম করিয়া জাতির বৃহত্তর কল্যাণের পথে দাঁড়াইতে সক্ষম হইবেন। নেতৃত্বের এই রূপ কোথায়, কবে জন্ম লইবে— ইহা আমরা জানি না; কিন্তু আশাহীন হইয়া বসিয়া থাকিবার সুযোগও আমাদের নাই। রুদ্ধদ্বার রাজনীতি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, সামাজিক অনৈক্য—এই সকল অসংখ্য নেতিবাচক সমস্যার মধ্যেও আমাদেরকে ইতিবাচকভাবে দেখিবার অভ্যাস গড়িয়া তুলিতে হইবে । কোনো জাতি হতাশার মধ্যে দীর্ঘকাল টিকিয়া থাকে না । আশাই সেই জাতিকে সামনের দিকে টানিয়া লইয়া যায় ।