আমরা এমন এক যুগে বাস করিতেছি, যাহাতে পরিবর্তন ঘটিতেছে দ্রুত চলমান-চিত্রের বেগে। আধুনিক জীবনের এই ঘূর্ণিপাকে মানসিক চাপ মানুষের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হইয়া পড়িয়াছে। ইহা যেন এক নীরব ঘাতক—শরীরকে ভিতর হইতে ক্ষয় করে, মনকে আচ্ছন্ন করে, আত্মাকে ক্লান্ত করিয়া ফেলে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে অনেকেরই মনে হয়—মানুষের জীবন যেন ইহকালেই দোজখের মহড়া দিতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলিতেছে—বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৮ কোটি মানুষ উদ্বেগ-জনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বিশ বছরে বৈশ্বিক মানসিক চাপের মাত্রা বাড়িয়াছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ দিন যত পার হইতেছে, মানুষের অন্তর্দহনও ততই তীব্র হইতেছে। প্রশ্ন জাগে—এইভাবে কি বাঁচা যায়? সমস্যা অনন্ত, বিপদ ফুরন্ত—ভালো দিনের পর খারাপ দিনের আগমন যেন অবধারিত নিয়ম হইয়া যাইতেছে।
না, এইভাবে নেতিবাচকভাবে চিন্তা করা যাইবে না। সেই প্রাচীনকাল হইতে দার্শনিকেরা বলিয়া আসিতেছেন—নেতিবাচক নহে, ইতিবাচকভাবেই চিন্তা করিতে হইবে। কারণ, মানসিক চাপ কেবল ধ্বংসের নহে, ইহা সৃষ্টিরও চালিকাশক্তি। মনোবিজ্ঞানী হ্যান্স সেল্যে যাহা বলিয়াছেন— ‘চাপহীন জীবন স্থবির হইয়া পড়ে'। তবে চাপের মাত্রা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলিয়া যায়, তখন ইহাই ধ্বংস ডাকিয়া আনে। আধুনিক জীবন যেন একটি প্রেসার কুকারের মতো—যেইখানে অল্প সময়ে কাজ সম্পন্ন হয়; কিন্তু সেফটি ভাল্ভ নষ্ট হইলে বিস্ফোরণ ঘটে।
ইতিহাস বলিয়া দেয়—মহৎ অর্জনের পিছনে প্রায়ই ছিল ভয়াবহ চাপের সহিত মানুষের লড়াই। যুদ্ধকালীন উদ্বেগের মধ্যে উইনস্টন চার্চিল বলিয়াছিলেন—‘আমার জীবনের দুশ্চিন্তাগুলির অধিকাংশই কখনো ঘটেই নাই।' লেবাননের কবি খলিল জিবরান লিখিয়াছেন——আমাদের উদ্বেগ ভবিষ্যতের কারণে আসে না, আসে ইহাকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হইতে।' জে কে রাউলিং বলিয়াছেন——কোনো কিছুতে ব্যর্থ না হইয়া বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।' এই উক্তিগুলির মর্মার্থ একটি জায়গায় আসিয়া মিলিয়া যায়, তাহা হইল—চাপ, ব্যর্থতা ও অস্থিরতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু আমরা তাহাকে কীভাবে গ্রহণ করি, তাহাই নির্ধারণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ। এই জন্য প্রাচীন শাস্ত্রে আত্ম-উপলব্ধিকে মানসিক শান্তির মূল চাবিকাঠি বলা হইয়াছে। আত্ম-উপলব্ধি তথা নিজেকে জানা মানে নিজের সীমা, সামর্থ্য ও দুর্বলতাগুলি অনুধাবন করা। যিনি নিজের অন্তর্জগৎ উপলব্ধি করেন, তিনি জানেন—চাপ আসিবে, আবার চলিয়াও যাইবে; কিন্তু তিনি ভাঙিবেন না। কারণ, আত্মজয় করিলে সকল জয় সম্ভব। এই আত্মজয় কখনো হঠাৎ ঘটে না—ইহা একটি দীর্ঘ সাধনা, যাহা অন্ধকার সময়েও মানুষকে অটল রাখে।
আজকের পৃথিবীতে টানেলের শেষপ্রান্তে আলো আছে কি না—ইহা লইয়া অনেকেই সংশয়ে থাকেন; কিন্তু সত্য হইল, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না, জানেন কেবল সৃষ্টিকর্তা। আমরা যতই কল্পনার প্রাসাদ গড়িয়া তুলি না কেন, ঘটনা কখনো সেই পথে চলে না। অতীত যেমন আমাদের বহু বার বিস্মিত করিয়াছে—দুর্যোগের পর নূতন অধ্যায় খুলিয়া দিয়াছে—ভবিষ্যতেও তাহাই হইবে। এই ক্ষেত্রে এক মহৎ বাণী স্মরণযোগ্য—‘যেই পথ তুমি দেখো না, সেই পথ দিয়াই আলোক আসে'। বস্তুত, মানুষ যখন ভবিষ্যতের সমস্ত পথ নিজের মস্তিষ্কে আঁকিয়া ফেলিবার চেষ্টা করে, তখনই উদ্বেগ জন্মায়। অথচ বিধাতা তাহার পথ নির্ধারণ করেন নিজস্ব নিয়মে। আজিকার বিজ্ঞানও বলিতেছে—উদ্বেগের বড় অংশ ঘটে অনিশ্চয়তাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার অক্ষমতা হইতে। সুতরাং অনিশ্চয়তাকে ভয় না করিয়া, ইহাকেই জীবনের স্বাভাবিক প্রকৃতি মনে করিয়া চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হইয়াও যদি আমরা আশাহত হই, তাহা হইলে ইহাই সৰ্ববৃহৎ নির্বুদ্ধিতা। কারণ, টানেলের দৈর্ঘ্য যতই দীর্ঘ হউক না কেন, আলো আসিবেই। প্রশ্ন কেবল এই—আপনি পথ চলিতে ক্লান্ত হইতেছেন কি না, কিংবা ভয় পাইতেছেন কি না। জীবনের অন্ধকার সময়ে এই বিশ্বাসই মানুষের বড় আশ্রয়। আল্লাহ প্রদত্ত সেই শক্তি ও বিশ্বাস আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নিহিত—আমরা তাহা অনুভব করিব কি না, তাহাই মূল কথা।