হজরত মুহম্মদ (সা)-এর আবির্ভাবের পর সমাজজীবনে নীতি ও নিষ্ঠার প্রবর্তন ঘটে এবং শান্তি ও সহমর্মিতাকে তিনিই মানবজীবনের আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বলেন যে প্রত্যেক মানুষের বাঁচার অধিকার আছে, স্বস্তির অধিকার আছে এবং নির্বিঘ্ন জীবনের অধিকার আছে। তাঁর সংক্ষিপ্ত বিদায়ী ভাষণে মানবাধিকারের নির্যাস সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
কিন্তু বিশ্বসভ্যতা যখন অত্যন্ত উন্নত স্তরে পৌঁছে গেছে তখনই সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর দুটি চরমতম আঘাত দেখতে পেলাম। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দিকের একটি আঘাতে সমস্ত পৃথিবী কেঁপে ওঠে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে এর অবসানে ধ্বংসের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পায়। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কামনা করে এমনটি যেন আর না ঘটে।
বিশ্বমানবের এই প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কগণ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানুয়ারি নিরপেক্ষতার জন্য খ্যাত সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ‘লিগ অব নেশনস’ স্বাপন করেন। কিন্তু শান্তি বেশিদিন সইল না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে বিবেকের সমস্ত দাবি লঙ্ঘন করে আর এক বিশ্বব্যাপী সংঘাত শুরু হলো। এর অবসান হলো ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। বিশ্বব্যাপী এমন প্রলয়ংকর সংঘাত যাতে আর কখনো না-হয় তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে উপস্থিত হলেন বিশ্বের বিভিন্ন শান্তিকামী দেশের প্রতিনিধিবর্গ। সে বছরেই পঞ্চাশটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ২৪ অক্টোবর ‘জাতিসংঘ’ স্থাপিত হলো। বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতির জয়যাত্রার সুদীর্ঘ ইতিহাসে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত মুহূর্ত। এই সংস্থার প্রধান লক্ষ্য মানুষ, রাষ্ট্র নয়। তাই এই সনদ শুরু হলো জনগণের নামে। বলা হলো: ‘আমরা জাতিসংঘভুক্ত জাতিসমূহ পরবর্তী বংশধরদের যুদ্ধের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ ঘোষণা করা হলো, জনগণই বিশ্ব ইতিহাসের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। মধ্যযুগীয় একনায়কত্ব বা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার সমাপ্তিঘণ্টা বেজে উঠল। জনগণের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ঘোষিত হলো এভাবে: ‘মৌল মানবিক অধিকার, মানুষের মর্যাদা ও মূল্য এবং ছোট-বড় জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকারের প্রতি এই সংস্থা পুনরায় আস্থা রাখার অঙ্গীকার করছে।’ ‘পুনরায়’ শব্দটি দ্বারা এই অধিকারগুলি যে হঠাত্ নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে না সে কথা বলা হলো।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্ব-মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। পরিষদের এই অধিবেশনটি হয়েছিল সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার জন্য খ্যাত ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। আশ্চর্য যোগাযোগ! এই ঘোষণার মৌল আকাঙ্ক্ষা মানবকল্যাণ। এতে রয়েছে সুন্দর ও মহত্ জীবনের আহ্বান। একে বলা চলে মানবিক জীবনদর্শন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে প্রায় এক শ’টি দেশ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এর প্রায় সব দেশেই যে শাসনতন্ত্র রচিত হয় তাতে মানবাধিকার ঘোষণায় বর্ণিত অধিকারসমূহ স্থান পেয়েছে, একে অনায়াসে মানবাধিকার ঘোষণার একটি বড় রকমের সার্থকতা বলে অভিহিত করা যায়। এই ঘোষণা মানুষকে তার অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করেছে, তার মনে এনে দিয়েছে জন্মগত অধিকার সম্বন্ধে দৃঢ় প্রত্যয়। (অংশবিশেষ)
লেখকের ‘মানবাধিকার’ (বাংলা একাডেমি, ১৯৮৫) বই থেকে