কেরানীগঞ্জ রিডেম্পশন: টেডএক্সের মঞ্চে প্রত্যাবর্তনের গল্প 

মঞ্চের আলো ও দর্শকের চোখ, দুটোই তখন প্রস্তুত আরও একটি গল্পের জন্য। টেডএক্স উত্তরার মঞ্চে দাঁড়িয়ে এআইএ লেমনস্কাই (আসিফ ইকবাল) যখন কথা বলা শুরু করলেন, তখন অনেকেই জানতেন না এই মানুষটা ছয়বছর ধরে জেলের অন্ধকারের সঙ্গে আলো ভাগাভাগি করে এসেছেন। তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল, ‘সম্ভাবনার শক্তি’ শুধু একটি প্রতিপাদ্য নয়, বরং এটি মঞ্চের মানুষটার জীবনের ভেতর গেঁথে থাকা দীর্ঘ এক গল্প। অসম্ভবের মধ্য দিয়েই কীভাবে সম্ভাবনা জন্মায়, সেই গল্পই তিনি শুনিয়ে গেলেন নিজের জীবন থেকে।

কারাবরণের সময় আইনজীবী তাকে বলেছিলো, বড়জোর দুই সপ্তাহ, তারপরই বের হতে পারবে সে। দুই সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর। শেষ পর্যন্ত মুক্তির মুখ দেখতে লেগে গেল দীর্ঘ ছয়বছর। এমন সময়ে বেশিরভাগ মানুষ পাথর হয়ে যায়—নিশ্চুপ, অনুভূতিহীন। কিন্তু আসিফ ইকবাল ছিলেন ব্যতিক্রম। কারাগারের সেই পাথুরে জীবনে তিনি ফুটিয়েছিলেন ফুল—গানে, রঙে, গল্পে। আশা ছাড়েননি, বরং আশাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নতুন মানে খুঁজেছেন। 

কারাগারের পাঁচ বছর পার করে তিনি লিখেছিল ‘আবার দেখা হলে’। গানটা যেন ছিল তার নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। ‘বছর পাঁচেক ঘুমের শেষে, হয়তো রোদেলা এক সকাল জাগবে’— এই লাইনগুলো তিনি লিখেছিলেন গভীর বিশ্বাস নিয়ে। তার কাছে রোদেলা সকাল মানে কোনো এক মুক্তির দিন। পাঁচ বছর পার হলেও যখন সেই সকাল আসেনি, তবু তিনি অপেক্ষা করেছেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল—সময় বদলায়, কিন্তু বুকের খাঁচার নীলাভ পাখিটা বদলায় না। শেষ পর্যন্ত সেই রোদেলা সকাল আসতে সময় লেগেছিল ছয় বছর। এই গানটা আজ বহু মানুষের প্রিয়, কিন্তু এটি ছিল একজন জেলবন্দীর নিঃশব্দ আশার চিঠি। তিনি টেডএক্সে মঞ্চ জানান দেন এই গানের গল্প। 2

জেলের ভেতরের জীবন নিয়ে বাইরের মানুষ খুব কমই জানে। সেই অন্ধকার, গুমোট পৃথিবীকে প্রথমে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন কাগজ আর কালি দিয়ে। লেখার জন্য কাগজ-কলম যোগাড়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাকে। সিগারেট, বিস্কিটের প্যাকেটের সাদাপিঠ আর লুকিয়ে ধার করা কলম দিয়ে গল্প লিখেছেন, এঁকেছেন, ভাবনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একসময় সেই কাগজগুলো পুড়িয়ে দেয় জেল কর্তৃপক্ষ। সব পুড়ে গেলেও, পোড়েনি তার ভেতরের সম্ভাবনার আশা। তিনি নতুন পথ খুঁজে নিলেন। স্থাপত্যবিদ্যার জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কারাগারের দেয়ালকেই বানালেন ক্যানভাস—ময়লা, বিবর্ণ দেয়ালে তুলির আচঁড়ে সাংকেতিক ভাবে ফুটিয়ে তুললেন গল্পগুলো। তার লেখা গানগুলোই হলো তার রোজনামচা। 

গল্পে বুঁদ হয়ে থাকা টেডএক্স শ্রোতাদের সম্ভাবনার সেই দিনগুলোর স্মৃতিতে নিয়ে যান তিনি। তার বেঁচে থাকার লড়াইটা শুধু শিল্পেই থেমে থাকেনি। নালা পরিষ্কার করা, দেয়াল রাঙানো—এগুলো শুধু প্রতীকী কাজ ছিল না, ছিল দৈনন্দিন জীবন বদলানোর চেষ্টা। সন্ধ্যা নামলেই বসাতেন গানের আড্ডা। সেই আড্ডা থেকেই জন্ম নেয় ‘কাকতাল’। তখনো তিনি জানতেন না, এই কাকতাল একদিন কত মানুষের জীবনের আবহসংগীত হয়ে উঠবে। শুধু আন্দাজ করতে পারতেন কারাকক্ষে আসা বন্ধু ও অচেনা ভক্তদের চিঠিতে, বুঝতেন দূরে কোথাও কেউ তার গান শুনছে, তাকে অনুভব করছে। সেই চিঠি, সেই ফেলে আসা বন্ধু-শহরের আবার দেখা পাওয়ার আশা থেকে লিখলেন গান 'আবার দেখা হলে'।

মঞ্চে যখন তিনি স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন তখন তিনি নিজের বন্দিজীবনকে এন্ডির শশাঙ্ক রিডেম্পশনের সঙ্গে তুলনা করে নাম দেন 'কেরানীগঞ্জ রিডেম্পশন'। যদিও এন্ডির চেয়ে আসিফ ইকবালের কাজের ঝুলি অনেক বড়ো। কারাগারের ভেতরের সময়ে থেমে না থেকে; সময়কে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। একজন বন্দি হয়েও তিনি ছিলেন জেলের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শক। কয়েদি-দের শ্রমে গড়ে তোলেন একটি লাইব্রেরি। বালুতে ঢাকা মাঠকে বদলে দেন খেলাধুলার উপযোগী জায়গায়। স্থাপন করেন স্কুল—যেখানে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পায়; শেখান স্থাপত্যবিদ্যা, গড়ে তোলেন জিমনেশিয়াম ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সংগীত ছিল তার আরেক আশ্রয়—কারাগারের লাউডস্পিকারে ভেসে উঠত ‘কাকতাল’-এর গান, জেল থেকেই রেকর্ড হয় তার অ্যালবাম, লেখা হয় শত শত গান। এসব কিছুই কোনো কৃতিত্ব জাহিরের প্রয়াস ছিল না; বরং এগুলো ছিল বেঁচে থাকার নীরব ও অভিনব কৌশল।

এ কাজগুলো তিনি কোনো মহান উদ্দেশ্যে করেননি। বরং তিনিই বলেছেন এসব ছিল তার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। তার কাছে বেঁচে থাকাটাই ছিল সম্ভাবনা। মানুষ যদি বেঁচে থাকে, তাহলে অসম্ভবও একদিন সম্ভব হয়—এই বিশ্বাসেই তিনি দিন গুনেছেন। আসিফ ইকবাল শশাঙ্ক রিডেম্পশনের এন্ডির মতো কোনো সিনেমার চরিত্র ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাস্তব জীবনের একজন, যিনি প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের ভাঙা সময়কে জোড়া লাগিয়েছেন সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীল ভাবনা থেকে। টেডএক্স উত্তরার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যখন গল্প বলছিলেন, তখন গল্পটা আর শুধু তার থাকেনি। সেটা হয়ে উঠেছিল প্রতিটি মানুষের গল্প—যারা কোনো এক অন্ধকারে আটকে আছে, তবুও চায় আলো ছাড়তে। টেডএক্স উত্তরার মঞ্চে এআইএ লেমনস্কাই প্রমাণ করে গেলেন, সম্ভাবনা কোনো মিথ নয়—এটি টিকে থাকার মন্ত্র। পাথরে ফুল ফোটানো অসম্ভব কিছু নয়, যদি সম্ভাবনার শক্তি থাকে তবেই তা সম্ভব।