ভালো ইতিহাস নির্মিত হয় রাষ্ট্রের দূরদর্শিতায়

মানুষের ইতিহাস কেবল উন্নতির ধারাবিবরণী নহে-ইহা একই সঙ্গে আক্রোশ, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ দলিল। ব্যক্তি যখন অপমানের প্রতিশোধ লইতে চাহে, তখন তাহা ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার প্রকাশ; কিন্তু রাষ্ট্র যখন প্রতিহিংসাকে নীতিতে পরিণত করে, তখন তাহার অভিঘাত হয় সুদূরপ্রসারী। কারণ, রাষ্ট্রের প্রতিহিংসা কেবল একক ব্যক্তিকে আঘাত করে না-ইহা আঘাত হানে ভবিষ্যৎ, সহাবস্থান ও মানবিক নৈতিকতার উপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেই সমাজ প্রতিহিংসাকে বিচার বলিয়া ভুল করে, সেই সমাজ অচিরেই ন্যায়বিচার হারায়।

এই সত্যটি কেবল তত্ত্বকথা নহে। আফ্রিকার রুয়ান্ডা রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক কঠিন অথচ শিক্ষণীয় উদাহরণ হাজির করে। ১৯৯৪ সালে হুতু ও তুতসি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত গণহত্যায় প্রায় আট লক্ষ মানুষ নিহত হয়। রাষ্ট্র কার্যত ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে অবিশ্বাস, রক্তক্ষরণ ও শোকের ছায়া বিস্তৃত হয়। সেই মুহূর্তে রুয়ান্ডার সামনে সহজ পথ ছিল-প্রতিহিংসার মাধ্যমে পালটা দমন; কিন্তু রাষ্ট্র সেই সহজ, অথচ আত্মঘাতী পথ বর্জন করে। রুয়ান্ডা গড়িয়া তোলে 'গাচাচা' নামক এক সম্প্রদায়ভিত্তিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থা। ইহার লক্ষ্য ছিল কেবল অপরাধীর শাস্তি নহে, বরং সত্য উদ্‌ঘাটন, স্বীকারোক্তি, অনুশোচনা এবং সামাজিক পুনর্মিলন। সমাজ আবার ধীরে ধীরে একত্র হইবার সুযোগ লাভ করে। এই প্রক্রিয়া নিখুঁত ছিল না, সমালোচনাও ছিল বিস্তর; কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-রাষ্ট্র প্রতিহিংসাকে নীতি করে নাই। ফলত, আজ রুয়ান্ডা আফ্রিকার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলির অন্যতম, যাহা অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করিয়াছে।

ইউরোপের ইতিহাসেও অনুরূপ শিক্ষা বিদ্যমান। উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের সংঘাত-যাহা 'দ্য ট্রাবলস' নামে পরিচিত-ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সহিংসতায় পরিণত হইয়াছিল। বোমা, হত্যা ও পালটা প্রতিশোধে সমাজ কার্যত বন্দি ছিল ভয় ও অবিশ্বাসের মধ্যে; কিন্তু ১৯৯৮ সালের 'গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট' দেখাইয়া দেয়, সংলাপ ও রাজনৈতিক সাহস কীভাবে প্রতিহিংসার চক্র ভাঙিতে পারে। উভয় পক্ষই সম্পূর্ণ ন্যায় পায় নাই-এই অভিযোগ আজও শোনা যায়। তথাপি, তারা এই উপলব্ধিতে পৌঁছায় যে, নিখুঁত প্রতিশোধের সন্ধানে থাকিলে শান্তি কখনো আসিবে না। আপস, ক্ষমা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়াই কেবল ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব।

এই সকল উদাহরণ আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়-প্রতিহিংসা আসলে শক্তির প্রকাশ নহে; ইহা দুর্বলতার আর্তনাদ। যে রাষ্ট্র নিজের আঘাত সারাইবার ক্ষমতা রাখে না, সেই রাষ্ট্রই প্রতিশোধের পথে হাঁটে। দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলিয়াছেন, ক্ষমা মানবিক স্বাধীনতার এক অপরিহার্য উপাদান-কারণ, ক্ষমা ব্যতীত মানুষ অতীতের অপরাধের নিকট চিরদিন বন্দি থাকিয়া যায়। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ইহা সত্য। অতীতের অন্যায় সংশোধনের নামে যদি কেবল নূতন অন্যায় সৃষ্টি হয়, তবে ইতিহাসের চাকা সামনের দিকে নহে-পিছনের দিকেই ঘোরে। বস্তুত, বিচার ও প্রতিহিংসা এক বস্তু নহে। বিচার হইতেছে নীতি, প্রমাণ ও আইনের শাসনের ফল। আর প্রতিহিংসা হইতেছে আবেগ, ঘৃণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার। বিচার সমাজকে স্থিতি দেয়, প্রতিহিংসা সমাজকে বিভক্ত করে। আজিকার বিশ্বে যেইখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্ষোভকে মুহূর্তে আগুনের মতো ছড়াইয়া দেয়, সেইখানে প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও সহজ, আরও জনপ্রিয়; কিন্তু ইতিহাস নির্মিত হয় হঠকারী জনপ্রিয়তায় নহে, নির্মিত হয় দূরদর্শিতায়।

সুতরাং, যদি আধুনিক এই সময়ে কোনো রাষ্ট্র সত্য সত্যই একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল সমাজ গড়িতে চাহে, তাহা হইলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রতিহিংসাকে নীতি করিয়া তুলিবার সহজ পথের লোভ সংবরণ করিতে হইবে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা সুস্পষ্ট-বিভাজন যত বেশি, অশান্তিও তত বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। ইহার বিপরীতে, যে কোনো অর্থে ঐক্যই শান্তির একমাত্র বাস্তব কৌশল।