প্রত্যেক সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে, এর স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, এবং নাগরিকদের কল্যাণে একজন নেতার বা রাষ্ট্রনায়কের বৈশিষ্ট্যাবলি ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়। যখন নেতারা তাহাদের শাসনব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সংবেদনশীলতা এবং দূরদর্শিতা দেখাইতে ব্যর্থ হন, তখন তাহার ফলাফল মারাত্মক হইয়া থাকে। এই ধরনের অবস্থা শুধু খারাপ শাসনব্যবস্থা বলিয়াই বিবেচিত হয় না, বরং লক্ষ লক্ষ নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল জনগণের জন্য কষ্টকর পরিণতি বহিয়া আনে। তাই, নেতাদের দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গভীর দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকিতে হয় এবং তাহাদের নীতিমালাগুলি যত্নসহকারে বাস্তবায়ন করিতে হয়, যাহাতে বিপর্যয়কর পরিণতি এড়াইয়া চলা যায়।
নেতৃত্ব হইল এমন একটি ক্ষমতা, যাহা জনগণকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে, আবার ঘৃণার জন্ম দিতে পারে। একটি দেশের সফলতা নির্ভর করে কতটা কার্যকরভাবে তাহার নেতারা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করিতে পারেন তাহার ওপর। রাজনৈতিক নেতারা যদি তাহাদের জনগণের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করেন, দুর্নীতিতে লিপ্ত হন বা বিভেদ সৃষ্টিকারী বক্তব্য বিবৃতি দেন, তাহা হইলে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলতা উপস্থিত হইতে পারে। পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের জনগণের সকল অংশের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হয়। ২০০০-এর দশকে জিম্বাবুয়েতে রবার্ট মুগাবের নেতৃত্ব একাধিকভাবে ব্যর্থ হইয়াছিল। সঠিক অর্থনৈতিক নীতির প্রতি অবজ্ঞা, এমনকি ভূমি সংস্কার উদ্যোগ দেশটির কৃষি উৎপাদনকে ধ্বংস করিয়াছিল। ফলে অতিমাত্রায় মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাপক বেকারত্ব এবং সারা দেশে দারিদ্র্য দেখা দেয়। যদিও মুগাবের নীতিগুলিতে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী উপকৃত হইয়াছিল, কিন্তু তাহাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডাকিয়া আনিয়াছিল।
অন্যদিকে, যেই সকল নেতা জনগণের প্রয়োজন এবং জাতির ব্যবস্থার জটিলতাগুলোর প্রতি সংবেদনশীল, তাহারা সাধারণত ভালো সিদ্ধান্ত নিতে এবং কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনা করিতে সক্ষম হইয়াছেন। ইতিহাসে এমন দেশগুলো দেখা গিয়াছে, যাহারা কার্যকর নেতৃত্ব পাইয়াছে, তাহারা সংকটগুলো ভালোভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হইয়াছে, বিপর্যয় হইতে ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারিয়াছে। কাজেই, নেতৃত্বের দায় শুধু শাসন করা নহে, বরং সুচিন্তিত ও কার্যকরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণও। যেমন, যখন অর্থনৈতিক সংকটের সময় আসে, তখন নেতাদের অবশ্যই বুঝিতে হইবে যে, অর্থনৈতিক কড়াকড়ি, করবৃদ্ধি অথবা সামাজিক কল্যাণের কাটছাঁট কতটা ক্ষতিকর হইতে পারে দুর্বল জনগণের জন্য। এই সকল উদ্যোগ সঠিকভাবে নীতিবদ্ধ না হইলে তাহা অসমতা বাড়াইতে পারে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হইতে পারে।
নেতৃত্বের একটি ক্ল্যাসিক্যাল উদাহরণ হইলেন ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। চার্চিলের সিদ্ধান্ত ছিল নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে একেবারে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার, যদিও সেই সময় ব্রিটেনের সামরিক অবস্থা ছিল সংকটময়। তাহার এই সিদ্ধান্ত ছিল শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া নহে, বরং একটি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক ইউরোপের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। চার্চিলের নেতৃত্ব প্রমাণ করিয়াছিল যে, একটি বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কখনো কখনো কঠিন, অপ্রিয় সিদ্ধান্ত লইতেই হয়।
অন্যদিকে, নেতারা যদি চিন্তাশীল নীতি গ্রহণ না করিতে পারেন, তাহা হইলে দেশটির ভবিষ্যৎ বিপদ অত্যাসন্ন হইয়া পড়ে। নেতাদের অবশ্যই বুঝিতে হবে, তারা সাধারণ মানুষের মতো ভাবিতে পারেন না। তাহাদের সিদ্ধান্ত এবং চিন্তাধারা যেইহেতু দেশের বৃহত্তর স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহাদেরকে বিচক্ষণ এবং কৌশলী হইতে হইবে। যখন নেতারা ব্যর্থ হন, দেশ দুর্দশাগ্রস্ত হয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করিয়াছে যে, নেতাদের যদি রাষ্ট্রনায়োকোচিত চিন্তাশীল নীতির অভাব থাকে, তাহা হইলে তা বিপর্যয় ঘটাতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে আমরা বরাবরই নেত্রত্বের সংকট দেখিতে পাই। এই সকল দেশে জাতির চাইতে সংকীর্ণ ব্যক্তি চিন্তা বড় হইয়া উঠে।