তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে 'রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা' যেন ললাটের লিখনে পরিণত হইয়াছে। এই সকল দেশে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পট পরিবর্তন বলিতে গেলে সুদূরপরাহত। প্রতি বারই জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ও পরে এই সকল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ঘোলাটে হইয়া উঠে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তরের সুযোগ কম থাকে বিধায় স্বৈরতন্ত্রের পথ যেমন তৈরি হয়, তেমনি সেই স্বৈরশাসনকে উৎখাতে বারংবার বিপ্লব-অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দেয়। এই সকল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার বলি হয় বহু বনি আদম। তাহার পরও ইহা হইতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেন না; কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশ কি যুগের পর যুগ ধরিয়া চলিতেই থাকিবে?
বাংলায় একটি বিশেষ বান্ধারা আছে, তাহা হইল- 'বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?' ঈশপের গল্পে আছে, ইঁদুরেরা বিড়ালের বিপদ হইতে বাঁচিতে তাহার গলায় ঘণ্টা বাঁধিবার কথা বলে; কিন্তু সেই সাহসী কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় কেহই আগাইয়া আসে না। জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করেন একজন রাষ্ট্রনায়ক; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে আজ রাষ্ট্রনায়কের বড়ই অভাব। আমরা জানি, 'নেতা (লিডার)' ও 'রাষ্ট্রনায়ক (স্টেটসম্যান)' শব্দ দুইটি সমার্থক মনে হইলেও প্রকৃত পক্ষে এই দুইটি ধারণার মধ্যে বিদ্যমান আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একজন নেতা হয়তো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বা দলের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জন করিতে পারেন; কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক দূরদর্শী এমন এক জননেতা যিনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করেন। তিনি সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠিয়া একতা ও রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। তাই দার্শনিক প্লেটোর মতে, একজন রাষ্ট্রনায়ক কেবল তাহার জনগণকে শিক্ষিতই করেন না, তিনি কোনো না কোনোভাবে তাহাদের চরিত্রও গঠন করেন। উন্নয়নশীল দেশসমূহে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতায় ফুলস্টপ দিতে হইলে রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতার প্রয়োজনীয়তা সবচাইতে অধিক।
এই প্রসঙ্গে আমরা বলিতে চাই, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দেশের চরম ক্লান্তিলগ্নে যাহা কিছু মুখে আসে তাহা বলিতে পারেন না। যেইভাবে এই সকল দেশে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়, তাহার শেষ কোথায়? ফলে একসময় বাঁচিয়া বা টিকিয়া থাকিবার জন্য সহিংসতা অনিবার্য হইয়া উঠে। ইহাকে কি আমরা সমর্থন করিতে পারি? যদি মনে করি তাহা সমর্থনযোগ্য নহে, তাহা হইলে দলের নামে যাহা খুশি তাহা আমরা বলিতে বা করিতে পারি না। যখন কোনো দেশে ভিন্নমত বা বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা ও ধৈর্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়, কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী অন্য পক্ষের মতামত শোনার মানসিকতা হারাইয়া ফালায় এবং কেবল নিজের মতাদর্শকেই একমাত্র সঠিক মনে করিয়া অন্যদের দমন করার চেষ্টা করে বা এমন নীতি গ্রহণ করে, তখনই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার জন্ম হয়। অথচ একটি সুস্থ ও সবল রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা অপরিহার্য। বিশেষ করিয়া গণতন্ত্রের সুরক্ষায় গণতন্ত্রের প্রাণই হইল বহুত্ববাদ-অর্থাৎ অনেক ধরনের মতামতের সহাবস্থান। যদি অসহিষ্ণুতা বাড়ে, তাহা হইলে গণতন্ত্র দুর্বল হইয়া পড়ে এবং একনায়কতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়। ইহার কারণে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।
অতএব, প্রতিটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় সহিংসতা ও অস্থিরতা হইতে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহারা যদি সহনশীল হন, তাহা হইলে তরুণ প্রজন্মও ধৈর্য ও শ্রদ্ধার রাজনীতি শিখিবে। অন্যথায়, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার এই সংস্কৃতি প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে ছড়াইয়া পড়িবে যাহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশসমূহ আজ দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অশিক্ষা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে একজন প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কই জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করিতে পারেন।