সদ্য বিদায়ি বৎসর তথা ২০২৫ সালে যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা দুর্ঘটনার সাক্ষী হইয়াছে পৃথিবী। ২০২৬-এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিবে, এমন স্বপ্ন সকলের চোখে, মানুষ আশায় বুক বাঁধিয়াছে বরাবরের মতোই। কিন্তু তাহাদের জন্য সম্ভাবনার বাণী শোনানো যাইতেছে না এখনই! বরং যাহারা বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাহাদের আশঙ্কা হইল, '২৬ সালে আরো খারাপ কিছু হয়তো অপেক্ষা করিতেছে বিশ্বের জন্য। এই বৎসর এমন সকল ঘটনার অবতারণা হইতে পারে, যাহার প্রভাবে গোটা বিশ্বের চেহারাই পালটাইয়া যাইতে পারে, এমনকি মানচিত্রও। একাধিক রাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বাধিবার সম্ভাবনা ইতিমধেই তৈরি হইয়া আছে।
এশিয়ার বাসিন্দাদের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হইল, এই বৎসর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া বিশ্লেষকদের দাবি। তাহাদের ভবিষ্যদ্বাণী বলিতেছে, পাকিস্তান-ভারত সংঘাতের পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অত্যাসন্ন এবং তাহা বাধিতে পারে ২০২৭-এর মধ্যেই। অর্থাৎ, ২০২৬ সাল যে এশিয়াকে আরামের ঘুম ঘুমাইতে দিবে না, তাহা উড়াইয়া দেওয়া যায় না। এই অঞ্চলে যেই সকল অভ্যুত্থান বা বিপ্লব ঘটিয়া গিয়াছে এবং তাহা সামলাইতে যাহারা এখনো হিমশিম খাইতেছেন, তাহাদের অবস্থা কী হইতে পারে, তাহা সময়ই বলিয়া দিবে। এদিকে, '২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করার প্রত্যয় মাথার মধ্যে নিয়াই নূতন বৎসরে পা রাখিয়াছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই বৎসর তিনি তাহার মিশন সফল করিয়া উঠিতে না পারিলে '২৭ সালের মধ্যে যে একটি মরণ কামড় দিবেন, হিসাব সেই কথাই বলিতেছে!
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে আমরা কী দেখিতেছি? ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান হয় নাই। গাজা যুদ্ধ থামিয়াছে বটে, কিন্তু হামলা-ধরপাকড়, হত্যা কি বন্ধ হইয়াছে? নিরীহ গাজাবাসীর কী হাল হইয়াছে, তাহা আমরা দেখিতেছি। অথচ যুদ্ধবাজ নেতাদের এই সকল সংঘাত-হানাহানি বন্ধের বিষয়ে কোনোই ভাবান্তর ঘটে নাই। আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলি কেমন আছে? বিশেষ করিয়া বলিতে হয় দক্ষিণ সুদানের কথা। নূতন বৎসরে সুদানিজরা কি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির মুখ দেখিবে? সেইখানকার দাঙ্গা বন্ধ হইয়া দেশে কি স্থিতিশীলতা ফিরিবে? সুদানের ন্যায় বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলির পরিস্থিতিই-বা কী? আবার যেই সকল দেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটিয়া গিয়াছে এবং তাহার রেশ ধরিয়া নামিয়া আসিয়াছে অন্ধকারের অমানিশা, সেই সকল ভূখণ্ডের মানুষের সময় কেমন কাটিবে এই বৎসর। নিশ্চিতভাবে ইহার সঙ্গে যুক্ত হইবে প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। বৃষ্টি ও বন্যার পাশাপাশি দাবানল বা ভূমিকম্পের আশঙ্কাও তাড়াইয়া নিয়া বেড়াইবে মানুষকে।
অর্থনীতিবিদরা পূর্বেই আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন যে, '২৬-এ বিশ্বকে ঘিরিয়া ধরিবে আর্থিক সংকট, বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়িয়া যাইবে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতির মারাত্মক আঘাতে বিধ্বস্ত হইবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত, যাহা বিভিন্ন দেশে ডাকিয়া আনিবে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। অবস্থা এখানেই শেষ হইবে না! বরং আশঙ্কা করা হইতেছে, এই বৎসর বিশ্বের বুকে চলিবে মহামারির হামলা! আবারও অজানা ভাইরাসের আক্রমণ হয়তো আসিতেছে, যাহা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রীতিমতো প্রতিযোগিতা করিয়া মানুষকে তাড়াইয়া মারিবে।
এই যখন অবস্থা, তখন সুষ্ঠুভাবে বাঁচিয়া থাকিবার উপায় কী? অস্থিরতা নূতন কিছু নহে, বরং ইহা সকল কালেরই একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। যুদ্ধবাজ পক্ষগুলি যতক্ষণ না তাহাদের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মিলাইতে পারিতেছেন, যতক্ষণ না মানুষ নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হইতেছে এবং যে অবধি শাসকগোষ্ঠী সত্যিকার অর্থেই একটি সুন্দর এবং ভীতিমুক্ত পৃথিবী গড়িয়া তুলিবার প্রতি মনোনিবেশ করিতেছেন, ততদিন পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন হইবে না। এইরূপ একটি অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে উন্নয়নশীল সমাজগুলির ধৈর্য সহকারে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করিয়া থাকা ছাড়া আর উপায় কী?