বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: দুর্যোগ মোকাবিলায় আস্থার কান্ডারি

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশসমূহের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতি বছর বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হয়। যে কোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস করা এবং দ্রæত পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করা। প্রতিক‚লতার মুখে কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সকলে কামনা করে। দুর্যোগ আক্রান্তদের সহায়তা প্রদান এবং দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার সম্পদ, স্থিত জনবল, সক্ষমতা এবং দৃঢ় সংকল্পকে সর্বদা কাজে লাগিয়েছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুর্ঘটনা, যেখানে সেনাবাহিনী সবার আগে উদ্ধারকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নতুবা ঝরে যেতে পারত আরো অনেক কোমলমতি প্রাণ।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব আর নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ এবং জাতির সেবা করে আসছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাথমিক লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা। প্রাথমিক লক্ষ্যের পাশাপাশি অনুরোধের ক্ষেত্রে যে কোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম কাজ। জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদচারণা অনন্য। শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেভাবে সংঘাতময় এলাকায় নিপীড়িত মানুষের জন্য মানবিক কাজ করছে তেমনি দেশের মধ্যে সৃষ্ট যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা অতুলনীয়। সাম্প্রতিক বছরসমূহে দেশের যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় দলমত-নির্বিশেষে সবাই প্রথমে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দুর্যোগ মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। ভবন ধস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস) কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করার কার্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবস্থান সর্বদা অগ্রভাগে। জলযান এবং বিশেষায়িত অনুসন্ধান দল ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী সর্বদা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল দল আহত ব্যক্তিদের নিজস্ব হাসপাতালে কিংবা নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরসহ চিকিৎসা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর আহতদের নিজ ব্যবস্থাপনায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা প্রদান করে।

বন্যা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অধিকাংশ বছর বাংলাদেশ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। বন্যার মতো সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার, ত্রাণ, বিতরণ কিংবা বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে সর্বদা অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যখনই বাংলাদেশে বন্যা আঘাত হেনেছে তখনই জনগণের ভরসার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব জনবল, সীমিত সম্পদ এবং যন্ত্রপাতি নিয়ে বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধ্যের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বন্যা ব্যবস্থাপনা অন্যান্য যে কোনো সংস্থার চেয়ে সুপরিকল্পিত। ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়সমূহকে মানবিক সহায়তা প্রদান, ত্রাণ শিবির স্থাপন, অনুসন্ধান, উদ্ধার কিংবা বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসনকাজে সেনাবাহিনীর অবদান সর্বজনস্বীকৃত। বন্যার সময় ত্রাণ শিবির স্থাপন করে আশ্রয়হীন ব্যক্তিদের আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসা প্রদানের যাবতীয় সহায়তা প্রদান করে। বন্যায় আটকে পড়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে উদ্ধারকরত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার জন্য সেনাসদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে। সেনাসদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করে মানুষের সুরক্ষা এবং কল্যাণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি ২০২৪ সালের বন্যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দিনে এবং রাতে ত্রাণ বিতরণ, আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার, হেলিকপটার থেকে শুকনা খাবারের প্যাকেট দেওয়া, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বস্ত্র বিতরণ কিংবা লাগাতার চিকিৎসাসেবা প্রদান করে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় এভাবে আত্মনিয়োগ করতে পেরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সর্বদা আত্মতৃপ্তির ছাপ পরিলক্ষিত হয়। ২০২৩ সালের বন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার এবং ত্রাণ বিতরণে সেনাবাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেনাবাহিনী পাহাড়ি বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরসহ বন্যার্তদের মধ্যে বিস্কুট, চিড়া, খেজুর, গুড়, রুটি, নুডুলস, স্যালাইন, গুঁড়া দুধ, চিনি, ওষুধ, পানি, মোমবাতি, দিয়াশলাইসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী নিরলসভাবে বিতরণ করে। ফলে পাহাড়ি জনপদের বহু লোকের প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

বন্যায় স্বাস্থ্যর ওপর গভীর প্রভাব পড়ে। জলবাহিত রোগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। সেনাবাহিনীর আর্মি মেডিক্যাল কোর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বদা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন এবং মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট মোতায়েনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী প্রতি বছর বন্যায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, কালভার্ট, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত কিংবা পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বন্যাদুর্গত ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম জেলায় বিশেষ আবাসন প্রকল্পের আওতায় গুণমান বজায় রেখে বন্যাদুর্গতদের জন্য ৩০০টি ঘর নির্মাণ করেছে। গুণমান এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে সেনাবাহিনী বরাদ্দকৃত ৫০ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র অর্ধেক টাকা ব্যয় করে মানসম্মতভাবে প্রকল্প সম্পন্ন করেছে।

ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ¡াসের সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপক‚লীয় অঞ্চলসমূহে ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ¡াসের সময় সেনাবাহিনী দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ এবং পানিসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, জলোচ্ছ¡াসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে যাবতীয় সহায়তা করে। উল্লিখিত ভূমিকাসমূহ পালন করে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনী আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, বুলবুল কিংবা আইলার মতো দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যাপক ত্রাণ এবং উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দ্রæত ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, খাবার, পানি এবং চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহসহ অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে রাস্তাঘাটসহ ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষিজ সামগ্রী বিতরণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিল।

রানা প্লাজা ধস চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ১৪ এপ্রিল ২০১৩ তারিখ এই ৯ তলা ভবনটি হঠাৎ করে ধসে পড়ে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১১৫ জন মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়। রানা প্লাজা ধসের পর সপ্তাহব্যাপী উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়। উক্ত উদ্ধারকার্যের শৃঙ্খলা সেনাবাহিনী কর্তৃক তদারক করা হয়। ধ্বংসাবশেষ অপসারণ, মৃতদেহ উদ্ধার এবং হস্তান্তর, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আহত কিংবা জীবিত অবস্থায় যাদের উদ্ধার করা হয় তাদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ধসের পরে নিখোঁজদের শনাক্তকরণ, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া, মৃতদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দাফনে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় সেনাবাহিনী নিজেদের দেশপ্রেম এবং দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দিয়েছে। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্তদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা দাফন কার্যে সহায়তা করে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হয়েছে। লকডাউন কার্যকর করার জন্য সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং উক্ত দায়িত্ব তারা দক্ষতার সঙ্গে পালন করে। কোভিড মহামারির সময় ঘরে ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সকলের মন জয় করে নেয়। বিশেষ করে, পার্বত্য অঞ্চলে সেনাসদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাইলের পর মাইল হেঁটে মাথায় খাবারের প্যাকেট বহন করে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়। কোভিড মহামারির সময় সেনাবাহিনীর ডাক্তারগণ জীবন বাজি রেখে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে মানবতার আরেক অনন্য নজির স্থাপন করে বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল কোভিড মহামারির সময় রোল মডেল স্বরূপ। দেশের বিভিন্ন স্থানে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপন করে সেনাবাহিনী কোভিড মহামারি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভূমিধস বাংলাদেশের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিশেষ করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার এলাকার পাহাড়ি ঢালে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সাধারণত ভূমিধস দেখা দেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভূমিধসে উদ্ধারকার্যে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে, ভূমিধসে আটকে পড়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা কিংবা মৃতদেহ উদ্ধারে সেনাবাহিনী তাদের প্রশিক্ষণ এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। ২০১৭ সালের জুন মাসে রাঙ্গামাটি জেলার মানিকছড়ির ভূমিধসে যোগাযোগব্যবস্থা সচল করার সময় পুনরায় ভূমিধসে দুই জন অফিসারসহ চার জন সেনাসদস্য নিহত এবং ১০ জন আহত হন, যা দেশের প্রয়োজনে নিজের জীবন বিপন্ন করে আপৎকালীন সময়ে আত্মনিয়োগ করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দেশে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সকল বড় অগ্নিদুর্ঘটনার উদ্ধারকার্যেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। জনবল, সরঞ্জাম এবং লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করে সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করে। যেখানে ফায়ার সার্ভিস ব্রিগেডের পক্ষে একা সামাল দেওয়া দুষ্করÑসেখানে সেনাবাহিনী দ্রæত সাড়া দিয়ে উদ্ধারকার্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২০২৩ সালে রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কিংবা নিউ মার্কেট-সংলগ্ন ঢাকা নিউ সুপারমার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা, উদ্ধারকার্য পরিচালনা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎসুক জনগণকে সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত দক্ষতা এবং আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। নতুবা উল্লিখিত অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

গত ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ চলাকালীন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এই বিমান দুর্ঘটনায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সবার আগে উদ্ধারকাজে অংশ নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনা অফিসারসহ সেনাসদস্যরা যেভাবে হাতে হাত ধরে শিশুদের উদ্ধার করেছে অথবা সেনাসদস্যরা যেভাবে ভ্যানে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে, তা অভাবনীয়। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর উদ্ধারকাজে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সাহসিকতা দেখিয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেনাবাহিনীর তৎপরতার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক আহতকে বের করা সম্ভব হয়েছে, নতুবা আরো ব্যাপক মৃত্যু হতো বলে অনুমেয়। এত দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কোটি কোটি বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করার পর সেনাবাহিনীর মোট ২৫ জন সেনাসদস্য অসুস্থ হয়েছিল, যার মধ্যে ১১ জন ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসা নিয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলার ওপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা সর্বদা নিজেদের প্রস্তুত রাখে। তথাপিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরঞ্জামাদির স্বল্পতা কিংবা উন্নতমানের সরঞ্জামাদির অভাব দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের প্রচেষ্টাকে ধীরগতি করে দেয়। ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা হলে দুর্যোগ মোকাবিলা আরো সহজতর হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে। দুর্যোগ প্রতিরোধ প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় আরো স্থিতিস্থাপকতা আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সেনাবাহিনী এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা আরো জোরদার করা সম্ভব। তবে আরো কার্যকরভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনী, সরকারি/বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন।

‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সেনাবাহিনী দেশের যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। দেশের যে কোনো দুর্যোগ কিংবা জরুরি অবস্থায় আপামর জনসাধারণের প্রাণের দাবি থাকে সেনাবাহিনী মোতায়েন কিংবা নিয়োগ করা। মূলত তারা তাকিয়ে থাকে কখন সেনাবাহিনী মোতায়েন হবে। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের আর্থসামাজিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঈর্ষণীয় অবদান রেখে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক প্রশাসন সাহায্য চাওয়ার পূর্বেই তারা উদ্ধারকার্যে মাঠে নেমে পড়েছে। সেনাবাহিনীর এই দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, মেরামত কিংবা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও তারা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। জাতি এবং দেশ গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করে যেমন হয়েছে নির্ভরতার প্রতীক, তেমনি কুড়িয়েছে আপামর জনসাধারণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর এই অগ্রণী ভূমিকা এবং সেবার প্রতি অব্যাহত অঙ্গীকার আরো স্থিতিস্থাপক জাতি এবং দেশ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ দুর্যোগ পূর্ববর্তী এবং চলাকালীন দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার সম্পদের গভীর সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের যে কোনো দুর্যোগ আরো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।

লেখক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা